শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তা নিয়ে আজ শনিবার (১০ অক্টোবর) মহালয়া উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল উপাসনালয়ে আয়োজন করা হয়েছে বিশেষ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ‘মাতৃরূপেণ সংস্থিতা’ শীর্ষক এ আয়োজনে দেবী দুর্গার আবাহন, চণ্ডীপাঠ, স্তোত্রপাঠ, ভক্তিমূলক সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তিসহ বিভিন্ন পরিবেশনার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষকে বরণ করে নেওয়ার আয়োজন রাখা হয়েছে। সন্ধ্যা ৬টায় শুরু হওয়ার নির্ধারিত এ অনুষ্ঠানের আয়োজক জগন্নাথ হল পরিবার ও জগন্নাথ হল সাংস্কৃতিক সংসদ।
মহালয়া বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। এই তিথির মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার আগমনের ক্ষণগণনা শুরু হয়। একই সঙ্গে প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও তাঁদের আত্মার শান্তি কামনায় বিভিন্ন ধর্মীয় আচার পালন করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। মহালয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন মন্দির ও পূজামণ্ডপে বিশেষ পূজা, চণ্ডীপাঠ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলও এ উপলক্ষে ধর্মীয় আচার ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আয়োজন করেছে বিশেষ অনুষ্ঠান।
আয়োজকদের প্রকাশিত অনুষ্ঠানসূচি অনুযায়ী, ‘মাতৃরূপেণ সংস্থিতা’ অনুষ্ঠানে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের পাশাপাশি সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি ও নাট্য পরিবেশনার সমন্বয় ঘটানোর পরিকল্পনা রয়েছে। দেবী দুর্গার শক্তিরূপ, মাতৃমহিমা এবং অশুভ শক্তির বিনাশের পৌরাণিক আখ্যান বিভিন্ন পরিবেশনার মধ্য দিয়ে তুলে ধরার কথা রয়েছে।
দেবী দুর্গার আবাহনে বিশেষ আয়োজন
মহালয়া মূলত দেবীপক্ষের সূচনালগ্ন হিসেবে পরিচিত। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস ও পৌরাণিক আখ্যান অনুযায়ী, এই সময় দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমনের বার্তা ধ্বনিত হয়। শরৎকালের দুর্গোৎসবকে ঘিরে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে যে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়, মহালয়া তারই সূচনাপর্ব।
জগন্নাথ হলের এবারের আয়োজনের নাম ‘মাতৃরূপেণ সংস্থিতা’। নামটির মধ্য দিয়ে জগতের সর্বত্র বিরাজমান মাতৃসত্তা ও দেবীর শক্তিরূপকে স্মরণ করার ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি বাঙালির শারদীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও শিল্পচর্চার বিভিন্ন দিককে একত্রিত করাই এ আয়োজনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
অনুষ্ঠানসূচিতে রয়েছে মঙ্গলদীপ প্রজ্বালন ও উদ্বোধনী পর্ব। প্রদীপ প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা এবং বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ ও স্তোত্রপাঠের মাধ্যমে ধর্মীয় আবহ সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর দেবী মাহাত্ম্য ও দেবীর বিভিন্ন রূপকে কেন্দ্র করে চণ্ডীপাঠ এবং নির্বাচিত স্তোত্রপাঠের আয়োজন রাখা হয়েছে।
চণ্ডীপাঠ মহালয়া ও দুর্গোৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষঙ্গ। দেবী মাহাত্ম্যের আখ্যানের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার শক্তি, সাহস ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে বিজয়ের কাহিনি তুলে ধরা হয়। মহালয়ার সঙ্গে চণ্ডীপাঠের এই ঐতিহ্য দীর্ঘদিন ধরে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত।
সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তিতে মাতৃবন্দনা
ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি জগন্নাথ হলের আয়োজনে সাংস্কৃতিক পরিবেশনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানসূচি অনুযায়ী, আগমনী গান, শ্যামাসংগীত ও ভক্তিমূলক সংগীতের মাধ্যমে দেবী দুর্গার আগমনকে স্বাগত জানানোর আয়োজন রয়েছে।
বাংলার শারদীয় সংস্কৃতিতে আগমনী সংগীতের বিশেষ স্থান রয়েছে। এসব গানে উমার পিতৃগৃহে ফিরে আসার আনন্দ, মায়ের আগমনের প্রতীক্ষা এবং পরিবারকেন্দ্রিক আবেগের প্রকাশ ঘটে। দেবী দুর্গাকে কেবল অসুরবিনাশিনী শক্তিরূপে নয়, বরং কন্যা ও মাতৃসত্তার প্রতীক হিসেবেও উপস্থাপন করা হয় এসব গানে।
এ ছাড়া গীতিআলেখ্য ও নৃত্যনাট্যের মাধ্যমে মহিষাসুরমর্দিনী, দেবীর শক্তিরূপ এবং মাতৃমহিমা তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। পুরাণ ও চণ্ডীর কাহিনিনির্ভর শ্রুতিনাটক, আবৃত্তি এবং আলেখ্য পাঠও অনুষ্ঠানসূচির অন্তর্ভুক্ত।
সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে ধর্মীয় আখ্যানকে শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ করার একটি সুযোগ তৈরি হয়। সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি ও নাট্যকলার সমন্বয়ে দেবী বন্দনার পাশাপাশি বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে এ আয়োজনে।
অনুষ্ঠানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে সম্মিলিত মাতৃবন্দনা। এর মাধ্যমে দেবীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি শান্তি, মঙ্গল, মানবিকতা ও শুভবোধের প্রত্যাশা তুলে ধরার ভাবনা রয়েছে আয়োজকদের প্রকাশিত বিবরণে।
মহালয়ার ধর্মীয় তাৎপর্য
মহালয়া হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে পূর্বপুরুষ স্মরণ এবং দেবীপক্ষের সূচনার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি তাৎপর্যপূর্ণ তিথি। প্রচলিত ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, এদিন অনেকেই প্রয়াত পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করেন। তর্পণের মাধ্যমে তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং আত্মার শান্তি কামনা করা হয়।
পিতৃপক্ষের অবসান ও দেবীপক্ষের সূচনার সঙ্গে মহালয়ার সম্পর্ক রয়েছে। দেবী দুর্গার আগমনকে কেন্দ্র করে এই দিন থেকেই শারদীয় দুর্গোৎসবের জন্য অপেক্ষা শুরু হয়। মহালয়ার ভোরে চণ্ডীপাঠ ও ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শোনার ঐতিহ্যও বাঙালি হিন্দু সংস্কৃতিতে বিশেষভাবে পরিচিত।
মহালয়ার সঙ্গে যুক্ত পৌরাণিক কাহিনিতে দেবী দুর্গার অসুরবিনাশিনী রূপের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। দেবী দুর্গাকে অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভশক্তির প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। ফলে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মহালয়া ন্যায়, সাহস, শক্তি ও কল্যাণের প্রত্যাশার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
এদিন দেশের বিভিন্ন মন্দির ও পূজামণ্ডপে বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালিত হচ্ছে। রাজধানী ঢাকার ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, রমনা কালীমন্দিরসহ বিভিন্ন স্থানে মহালয়া উপলক্ষে ধর্মীয় আচার ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের খবর পাওয়া গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলও এ ধারাবাহিকতায় নিজস্ব আয়োজন করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চর্চা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের একটি পরিচিত কেন্দ্র। হলটির বিভিন্ন উৎসব, পূজা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ তৈরি হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উপলক্ষকে কেন্দ্র করে আয়োজিত অনুষ্ঠান শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক পরিচিতি এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের ক্ষেত্র তৈরি করে। বিশেষ করে মহালয়া ও দুর্গোৎসবকে ঘিরে আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলোতে ধর্মীয় সংগীত, আবৃত্তি, নৃত্য এবং অন্যান্য শিল্পমাধ্যমের সমন্বয় দেখা যায়।
জগন্নাথ হলের এবারের ‘মাতৃরূপেণ সংস্থিতা’ আয়োজনেও ধর্মীয় আচার ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার সমন্বয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। মঙ্গলদীপ প্রজ্বালন, চণ্ডীপাঠ, আগমনী সংগীত এবং মাতৃবন্দনার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি শিল্প ও সংস্কৃতির বিভিন্ন মাধ্যমকে একত্রিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শনার্থী বা শিক্ষার্থীর সংখ্যা, অতিথিদের বক্তব্য এবং আয়োজনের সার্বিক পরিবেশ সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটিতে সেগুলো যুক্ত করে আরও পূর্ণাঙ্গ করা যাবে।
দুর্গোৎসবের অপেক্ষা
মহালয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া দুর্গোৎসবের ক্ষণগণনা বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। দেবীর আগমনের প্রতীক্ষা, পূজার প্রস্তুতি, মণ্ডপসজ্জা এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনকে কেন্দ্র করে উৎসবের আবহ তৈরি হতে থাকে।
চলতি বছরের মহালয়া ১০ অক্টোবর শনিবার পালিত হচ্ছে। মহালয়াকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের পাশাপাশি দুর্গাপূজার প্রস্তুতিও এগিয়ে চলছে। দুর্গোৎসবের মূল দিনগুলোকে সামনে রেখে মন্দির ও পূজামণ্ডপগুলোতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে।
জগন্নাথ হলের ‘মাতৃরূপেণ সংস্থিতা’ অনুষ্ঠান সেই ধারাবাহিকতায় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের একটি অংশ। দেবী দুর্গার বন্দনা, চণ্ডীপাঠ, সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তির মাধ্যমে মহালয়ার তাৎপর্য তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে এতে।
সব মিলিয়ে, মহালয়াকে কেন্দ্র করে জগন্নাথ হলের এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেবী দুর্গার আগমনী বার্তার মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবের অপেক্ষায় থাকা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য দিনটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
মন্তব্য
লোড হচ্ছে…