ঢাকা - যথাযোগ্য মর্যাদা, ভাবগাম্ভীর্য এবং নানাবিধ স্মরণীয় কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আজ ১৫ অক্টোবর ২০২৬, বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শোক দিবস পালিত হয়েছে। ১৯৮৫ সালের এই রাতে জগন্নাথ হলের অডিটোরিয়ামের ছাদ ধসে প্রাণ হারানো ৪০ জন ছাত্র, কর্মচারী ও অতিথিদের স্মৃতি প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন এবং আহতদের প্রতি সমবেদনা জানাতে দিনব্যাপী এ দিবসটি উদযাপন করা হয়।

স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা ও শোকের পরিবেশ

দিবসের সূচনাতেই সমগ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এক আবেগঘন ও শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল আবাসিক হল, হোস্টেল এবং প্রশাসনিক ভবনসমূহে জাতীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয় এবং কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ কালো ব্যাজ ধারণ করেন।
সকাল সাড়ে ৭টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বস্তরের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ জগন্নাথ হল স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন এবং নিহতদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।

স্মৃতি অডিটোরিয়ামে আলোচনা সভা

স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর জগন্নাথ হলের কিশোরীলাল রায় চৌধুরী অডিটোরিয়ামে এক বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। জগন্নাথ হলের ঐতিহ্যবাহী এই অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ।

আলোচনা সভায় উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম নিহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ব্যক্ত করে বলেন,
"১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবরের এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সমগ্র বাংলাদেশের মানুষকে এক সুতোয় গেঁথেছিল। ঐক্য ও সংহতির এই শক্তিশালী বন্ধনকে আমাদের আরও সুদৃঢ় করতে হবে এবং সমাজজুড়ে তা ছড়িয়ে দিতে হবে।"

ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে তাঁর প্রশাসনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে উপাচার্য আরও বলেন,
"ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে শতভাগ নিরাপদ রাখতে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে চাই—যেখানে আবাসিক হলগুলোসহ নিজ নিজ বাসস্থানে সবাই নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে বসবাস করতে পারবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কারো একক সম্পত্তি নয়, এটি সবার। সবাইকে নিয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। একটি নিরাপদ ও মানবিক ক্যাম্পাস বিনির্মাণে আমি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করছি।"

সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. দেবাশীষ পাল, সাবেক প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. অজয় কুমার দাস, জগন্নাথ হল অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের সভাপতি তপন চন্দ্র মজুমদার ও সাধারণ সম্পাদক নিবাস চন্দ্র মাঝি বক্তব্য প্রদান করেন।

এছাড়াও বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন, ১৯৮৫ সালের মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় আহত ছাত্র প্রতিনিধি ও বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. হিমাদ্রি শেখর চক্রবর্তী। আলোচনা সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অফিসার্স এসোসিয়েশন, কর্মচারী সমিতি, কারিগরী কর্মচারী সমিতি ও চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারী ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন অনুষদের ডিন, হলের প্রাধ্যক্ষ, শিক্ষক ও অ্যালামনাইবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

দিনব্যাপী বিচিত্র সব কর্মসূচি

১৫ অক্টোবর স্মরণে বিশ্ববিদ্যালয় ও হল প্রশাসন দিনব্যাপী বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মসূচির আয়োজন করে:

• বিশেষ প্রার্থনা সভা ও মোনাজাত: নিহতদের আত্মার শান্তি ও সদগতি কামনায় সকালে জগন্নাথ হল প্রাঙ্গণে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের বিশেষ প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাদ আসর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ ( মসজিদুল জামিআ’)-সহ ক্যাম্পাসের সকল হল মসজিদে দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করা হয়।

• রক্তদান কর্মসূচি: সকাল থেকেই জগন্নাথ হল প্রাঙ্গণে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করা হয়, যেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সারিবদ্ধভাবে রক্তদানে অংশ নেন।

• প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক আয়োজন: জগন্নাথ হল প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দুর্ঘটনা সম্পর্কিত ঐতিহাসিক ছবি, নিহতদের তৈলচিত্র ও স্মৃতিবিজড়িত দ্রব্যাদি প্রদর্শন করা হয়। সন্ধ্যা ৬:৩০টায় হল উপাসনালয়ে আয়োজন করা হয় আবেগঘন শোক সঙ্গীত ও কবিতা আবৃত্তি।

• স্মৃতি প্রতিযোগিতা: দিবসটি উপলক্ষে জগন্নাথ হল প্রশাসনের উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ‘অক্টোবর স্মৃতি রচনা প্রতিযোগিতা’ ও ‘অক্টোবর স্মৃতি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা’-এর বিশেষ আয়োজন করা হয়।

ফিরে দেখা: ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবরের সেই কালো রাত

উল্লেখ্য, ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর রাতে তীব্র ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে তৎকালীন জগন্নাথ হলের অ্যাসেম্বলি হলে (বর্তমান কিশোরীলাল রায় চৌধুরী অডিটোরিয়াম) বাংলাদেশ টেলিভিশনে জনপ্রিয় নাটক 'শুকতারা' দেখছিলেন ছাত্র ও অতিথিরা। রাত পৌনে ৯টার দিকে আকস্মিকভাবে ভবনটির প্রাচীন ছাদ ধসে পড়ে।
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ২৬ জন ছাত্র, ১৪ জন অতিথি ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারীসহ মোট ৪০ জন মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান এবং আহত হন আরও শতাধিক শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থী। সেই করুণ স্মৃতিকে স্মরণ করে এবং ক্যাম্পাসের ভবনগুলোর নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার তাগিদ নিয়ে প্রতি বছর ১৫ অক্টোবরকে 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শোক দিবস' হিসেবে পালন করা হয়।