“ফ্রেমের বাইরে” সিরিজের প্রথম পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ISWR) শিক্ষার্থী ও আন্তর্জাতিক ভূগোল অলিম্পিয়াডগামী বাংলাদেশ দলের দলপ্রধান তাহসিন মোহাম্মদ এর মুখোমুখি হয়েছেন DU TIMZ এর প্রতিনিধি তাসনীম হুমাইরা । এ কথোপকথনে উঠে এসেছে রাশিয়ার সিডিয়াসে অনুষ্ঠিতব্য মাল্টিন্যাশনাল ইউথ জিওগ্রাফি অলিম্পিয়াড (MY-GEO) ২০২৬ এ বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার অভিজ্ঞতা, বিশ্বমঞ্চে তরুণদের ভূগোল ও জলবায়ু ভাবনার গুরুত্ব এবং একদল উদীয়মান শিক্ষার্থীকে নেতৃত্বের মাধ্যমে প্রস্তুত করার পেছনের গল্প।

আগামী ২৪ থেকে ৩১ অক্টোবর রাশিয়ার সিরিয়াসে বসছে “মাল্টিন্যাশনাল ইউথ জিওগ্রাফি অলিম্পিয়াড (MY-GEO) ২০২৬”। রাজধানীর রাশিয়ান হাউসে আয়োজিত তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বাছাই পর্বের মাধ্যমে ভূগোলভিত্তিক জ্ঞান, বিশ্লেষণাত্মক চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা প্রমাণ করে ৯ সদস্যের বাংলাদেশ দল এই আন্তর্জাতিক মঞ্চে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে। এই গৌরবময় প্রতিনিধিদলের টিম লিডার বা দলপ্রধান হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন আমাদেরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাহসিন মোহাম্মদ। বিশ্বের তরুণদের সাথে প্রাকৃতিক ও মানবিক ভূগোল, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও টেকসই আঞ্চলিক উন্নয়নের মতো বৈশ্বিক ইস্যু নিয়ে লড়াইয়ে নামার ঠিক প্রাক্কালে, তাঁর এই যাত্রা, প্রস্তুতি এবং স্বপ্নের পথচলাকে সবার সামনে তুলে ধরতেই আমাদের এই আয়োজন।

১. ছোটবেলায় টেলিভিশন স্ক্রিনে ‘ডিসকভারি’ ও ‘অ্যানিমেল প্ল্যানেট’ দেখে জীবজগতের প্রতি যে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকে বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড হয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চ পর্যন্ত পৌঁছানোর পথচলাটা কেমন ছিল?

ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতি এবং জীবজগতের প্রতি আমার একটা আলাদা কৌতূহল ছিল। বিশেষ করে ডিসকভারি আর অ্যানিমেল প্ল্যানেট দেখার সময় বিভিন্ন প্রাণীর আচরণ, তাদের বেঁচে থাকার কৌশল কিংবা প্রকৃতির অদ্ভুত সব বিষয় আমাকে বেশ আকর্ষণ করত। একটা প্রাণী কেন নির্দিষ্টভাবে আচরণ করছে, কোনো বিশেষ পরিবেশে কীভাবে টিকে থাকছে, এসব নিয়ে নিজের মধ্যেই অনেক প্রশ্ন তৈরি হতো।

তখন অবশ্য কখনো ভাবিনি যে এই আগ্রহটা একদিন আমাকে আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াড পর্যন্ত নিয়ে যাবে।

ধীরে ধীরে বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের সঙ্গে পরিচয় হয়। জীববিজ্ঞানের পাশাপাশি রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, গণিতসহ বিভিন্ন বিষয়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে শুরু করি। প্রথমদিকে মূল উদ্দেশ্য ছিল নিজের জ্ঞান যাচাই করা এবং নতুন কিছু শেখা। কিন্তু একটা সময় বুঝতে পারলাম, অলিম্পিয়াডের সবচেয়ে সুন্দর দিক হচ্ছে এখানে শুধু মুখস্থ বিদ্যা দিয়ে সবকিছুর সমাধান করা যায় না। কোনো একটা সমস্যাকে বুঝতে হয়, বিশ্লেষণ করতে হয় এবং নিজের অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগাতে হয়।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছানোর পথটা অবশ্য খুব সহজ ছিল না। প্রস্তুতি, সুযোগের সীমাবদ্ধতা, আর্থিক বিষয়সহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ছিল। তারপরও চেষ্টা করে গেছি।

রাশিয়ায় আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাওয়াটা আমার জন্য বড় একটা অভিজ্ঞতা ছিল। তবে আমার কাছে এই যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু পদক অর্জন নয়। বরং ছোটবেলার একটা সাধারণ কৌতূহল থেকে ধীরে ধীরে এতগুলো নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত হতে পারাটাই অনেক বড় ব্যাপার।

২. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে পড়ার পাশাপাশি বিজ্ঞানভিত্তিক আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াড ও জলবায়ু সম্পর্কিত কাজে নিজেকে সক্রিয় রাখার অনুপ্রেরণা কোথায় পান?

আমার পড়াশোনার বিষয় এবং বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করার মধ্যে অনেকেই হয়তো সরাসরি কোনো সম্পর্ক খুঁজে পান না। কিন্তু আমার নিজের কাছে বিষয়গুলো কখনো পুরোপুরি আলাদা মনে হয়নি।

আমি ছোটবেলা থেকেই সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। বেশ অল্প বয়সেই সাংবাদিকতা শুরু করি এবং পরবর্তী সময়েও খণ্ডকালীনভাবে এই কাজের সঙ্গে সক্রিয় ছিলাম। বর্তমানে সাংবাদিকতা থেকে কিছুটা বিরতি নিচ্ছি, কিন্তু এই অভিজ্ঞতাটা আমার চিন্তাভাবনা এবং কাজের ধরনকে অনেক প্রভাবিত করেছে।

সাংবাদিকতার কারণে খুব অল্প বয়স থেকেই বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলা, তাদের সমস্যা বোঝা, তথ্য সংগ্রহ করা এবং সামাজিক বিভিন্ন বিষয়কে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা কিংবা প্রকাশ্যে কথা বলার বিষয়টাও তাই আমার জন্য খুব একটা বড় সমস্যা ছিল না।

পাশাপাশি আমি ছোটবেলা থেকেই যুবদূত এবং জলবায়ুদূত হিসেবে বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থেকেছি। ইউএনডিপি ও ইউনিসেফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা আমার চিন্তাভাবনা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছে।

এসব কাজ করতে গিয়েই আসলে মানুষের জীবন, সামাজিক বৈষম্য, পরিবেশগত সংকট এবং উন্নয়ন নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা করার ক্ষেত্রেও এই অভিজ্ঞতাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কারণ আমি মনে করি, জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা পরিবেশগত সমস্যা শুধু বিজ্ঞানের বিষয় নয়। এগুলোর সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক কল্যাণের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

আমার কাছে সমাজকল্যাণ এবং পরিবেশবিজ্ঞান অনেকটা একই সমস্যাকে দুই দিক থেকে দেখার মতো। একটা আমাদের সমস্যার বৈজ্ঞানিক দিকগুলো বুঝতে সাহায্য করে, অন্যটা সেই সমস্যার কারণে মানুষের জীবনে কী প্রভাব পড়ছে, সেটা বুঝতে সাহায্য করে।

ভবিষ্যতে এই দুই ক্ষেত্রকে একসঙ্গে নিয়ে গবেষণা এবং বাস্তবভিত্তিক কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে।

৩. জীববিজ্ঞানের পাশাপাশি রসায়ন, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা আপনার রয়েছে। এতগুলো ভিন্ন বিষয়ে জানার এই অদম্য কৌতূহল কীভাবে ধরে রাখেন?

আসলে আমি কখনো কোনো একটা বিষয়ের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইনি। নতুন কিছু জানতে ভালো লাগে, আর একটা বিষয় সম্পর্কে জানতে গিয়ে যখন অন্য একটা বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্ক খুঁজে পাই, তখন সেটা আমার কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার মধ্যে অনেক সম্পর্ক রয়েছে। জীববিজ্ঞানের কোনো বিষয় বুঝতে গেলে রসায়ন জানতে হয়, রসায়নের অনেক বিষয় বুঝতে পদার্থবিজ্ঞানের প্রয়োজন হয়, আবার এসবের বিশ্লেষণে গণিত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এমনকি পরিবেশবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করতে গেলেও ভূগোল, জীববিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান এবং পরিসংখ্যান সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন।

আমি অবশ্য সব বিষয়ে সমান দক্ষ, এমন দাবি করব না। বরং অনেক বিষয়ে এখনও শেখার পর্যায়ে আছি। কিন্তু কোনো কিছু বুঝতে না পারলে সেটার প্রতি আমার আগ্রহ অনেক সময় আরও বেড়ে যায়।

অলিম্পিয়াডের একটা ভালো দিক হচ্ছে, এখানে নিয়মিত নিজের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়। নতুন ধরনের সমস্যা আসে, অনেক সময় উত্তর জানা থাকে না। তখন নতুনভাবে চিন্তা করার সুযোগ হয়।

আমার মনে হয়, কৌতূহল ধরে রাখার জন্য সবকিছু জানার প্রয়োজন নেই। বরং এখনও কত কিছু জানার বাকি, সেটা উপলব্ধি করতে পারাটাই যথেষ্ট।

৪. রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত ওপেন ইন্টারন্যাশনাল বায়োলজি অলিম্পিয়াডে ব্যক্তিগতভাবে ব্রোঞ্জপদক অর্জনের স্মৃতি এবং সেই প্রতিযোগিতার মূল চ্যালেঞ্জগুলো কেমন ছিল?

ওপেন ইন্টারন্যাশনাল বায়োলজি অলিম্পিয়াড আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগীদের সঙ্গে একই মঞ্চে অংশগ্রহণ করার অনুভূতিটা একেবারেই আলাদা। সেখানে সবাই নিজের দেশের প্রতিনিধিত্ব করছে, প্রত্যেকের প্রস্তুতির ধরন আলাদা এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ জায়গা থেকে অনেক পরিশ্রম করে এসেছে।

প্রতিযোগিতার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক দক্ষতা এবং বিশ্লেষণক্ষমতার প্রয়োজনীয়তা। আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের অনেকেরই আধুনিক পরীক্ষাগারে নিয়মিত কাজ করার সুযোগ নেই। ফলে আন্তর্জাতিক মানের ব্যবহারিক পরীক্ষার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটা কিছুটা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

আমার ক্ষেত্রেও ব্যবহারিক অংশটা বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। অনেক কিছু আগে থেকে জানা থাকলেও নির্দিষ্ট সরঞ্জাম ব্যবহার করে সীমিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা।

তবে প্রতিযোগিতায় ব্রোঞ্জপদক অর্জন করতে পারাটা অবশ্যই আনন্দের ছিল। বিশেষ করে প্রস্তুতির সময়কার সীমাবদ্ধতাগুলোর কথা চিন্তা করলে এই অর্জনটা আমার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

তবে আমার কাছে পদকের পাশাপাশি আরেকটা বিষয় খুব মূল্যবান। সেটা হচ্ছে বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং বন্ধুত্ব তৈরি হওয়া।

কম্বোডিয়ার একজন অংশগ্রহণকারী একবার আমাকে বলেছিলেন, তাঁর কাছে আমি পুরো প্রতিযোগিতার সবচেয়ে দারুণ মানুষ। কথাটা হয়তো খুব সাধারণ, কিন্তু আমার কাছে এটা অনেক সুন্দর একটা স্মৃতি হয়ে আছে।

আমার মনে হয়, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিগুলোর একটি হচ্ছে এই অভিজ্ঞতা এবং মানুষের সঙ্গে তৈরি হওয়া সম্পর্কগুলো।

৫. আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে আর্থিক সংকটসহ নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে যখন শেষ পর্যন্ত রাশিয়া যাওয়ার সুযোগ হলো, তখন সেই মুহূর্তের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে অংশ নিতে গেলে প্রতিযোগিতার প্রস্তুতির বাইরেও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। বিশেষ করে আর্থিক বিষয়টা অনেক সময় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

একজন শিক্ষার্থী হয়তো অনেক পরিশ্রম করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অংশগ্রহণের সুযোগ অর্জন করেছে, কিন্তু এরপর বিমানভাড়া, ভিসা এবং অন্যান্য খরচের ব্যবস্থা করাটা তার এবং তার পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

আমার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন ধরনের অনিশ্চয়তা ছিল। একটা সময় পর্যন্ত পুরো বিষয়টা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত যখন রাশিয়া যাওয়ার সুযোগ হলো, তখন অবশ্যই অনেক আনন্দ এবং স্বস্তি পেয়েছিলাম। তবে আনন্দের পাশাপাশি একটা দায়িত্ববোধও কাজ করছিল। কারণ দেশের বাইরে গিয়ে নিজের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার একটা বিষয় ছিল।

এই সফরের আরেকটা বিশেষ দিক হচ্ছে, পুরো আন্তর্জাতিক যাত্রাটা আমাকে একাই সম্পন্ন করতে হয়েছিল। বাংলাদেশ থেকে রাশিয়া যাওয়া, মস্কোতে চলাফেরা করা, প্রয়োজনীয় যাতায়াতের ব্যবস্থা করা এবং ফেরার পুরো যাত্রাটাও নিজেকে সামলাতে হয়েছে। প্রতিযোগিতার নির্ধারিত স্থানে পৌঁছানোর পর অন্য অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম।

সত্যি বলতে, এই অভিজ্ঞতাটা আমাকে অনেক বেশি আত্মনির্ভরশীল করেছে।

নতুন একটা দেশে একা চলাফেরা করতে গিয়ে অনেক কিছু শিখেছি। কিছু পরিস্থিতি অপ্রত্যাশিত ছিল, কিছু সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হয়েছে।

এখন মনে হয়, রাশিয়ায় যাওয়াটা আমার কাছে শুধু একটা আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ ছিল না। নিজের সামর্থ্য, আত্মবিশ্বাস এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে নতুনভাবে বোঝার একটা সুযোগও ছিল।

৬. সম্প্রতি রাশিয়ার সোচিতে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিয়াড অন ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইস্যুজে বাংলাদেশের জাতীয় প্রতিনিধি দলের একাডেমিক টিম লিডার হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং দিনশেষে দলটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের জন্য গৌরব অর্জনের পর অনুভূতি কেমন ছিল?

আসলে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অলিম্পিয়াডের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা শুধু একাডেমিক টিম লিডার হিসেবে শুরু হয়নি।

২০২৫ সালে আমি নিজেই ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিয়াড অন ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইস্যুজে অংশগ্রহণ করেছিলাম এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে স্বর্ণপদক অর্জন করি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে প্রতিযোগিতার ধরন, প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা এবং বিভিন্ন রাউন্ডের চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে একটা ভালো ধারণা তৈরি হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে যখন বাংলাদেশ দলের একাডেমিক প্রস্তুতির দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ আসে, তখন সেই অভিজ্ঞতাগুলো কাজে লাগানোর চেষ্টা করি।

আমাদের জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা বাংলাদেশ অলিম্পিয়াড অন ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইস্যুজ যৌথভাবে আয়োজন করে সাস্টেইনেবিলিটি অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সেস নেটওয়ার্ক এবং জিরো কম্পিটিশনস। আন্তর্জাতিক আয়োজনের সঙ্গে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্বের বিষয়েও আমরা কাজ করি।

তবে এবারের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আমি নিজে দলের সঙ্গে রাশিয়া যেতে পারিনি। কারণ সেই সময় আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা চলছিল। ফলে দেশে থেকেই একাডেমিক প্রস্তুতির কাজগুলো চালিয়ে যেতে হয়েছে।

এটা কিছুটা কঠিন ছিল। কারণ দিনের বেশির ভাগ সময় নিজের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হতো। আর রাতে পড়াশোনা শেষ করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে দলের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতাম।

প্রতিযোগিতার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো, প্রস্তুতির অগ্রগতি দেখতাম এবং যেসব বিষয়ে সমস্যা হচ্ছে, সেগুলো নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করতাম।

অবশ্য পুরো কাজটা আমি একা করিনি। আমার বন্ধু, সহকর্মী এবং সংগঠনের অন্য সদস্যরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। একসঙ্গে কাজ করার কারণেই এতগুলো বিষয় সামলানো সম্ভব হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত যখন দল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভালো ফলাফল করল, তখন সত্যিই অনেক আনন্দ পেয়েছিলাম।

নিজে স্বর্ণপদক অর্জনের অনুভূতি আর নিজের প্রস্তুতিতে যুক্ত থাকা একটা দলকে সফল হতে দেখার অনুভূতি একেবারে এক নয়।

কারণ এবার নিজের ফলাফলের চেয়ে শিক্ষার্থীদের সাফল্যটাই আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

৭. পর্দার আড়ালের নানামুখী চাপ, গভীর রাতের প্রস্তুতি এবং দেশ থেকে তরুণ দলটিকে সার্বিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক দলের একাডেমিক দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানো।

সেই সময় নিজের পড়াশোনায় অনেক বেশি মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। দিনের বড় একটা অংশ পড়াশোনার মধ্যেই কাটত। কিন্তু একই সঙ্গে দলের প্রস্তুতির কাজগুলোও চালিয়ে যেতে হতো।

অনেক দিন এমন হয়েছে, সারা দিন নিজের পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা করেছি, তারপর রাতে দলের সদস্যদের সঙ্গে অনলাইনে বসেছি। কখনো তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে, কখনো ব্যবহারিক পরীক্ষার প্রস্তুতি, আবার কখনো প্রজেক্ট বা অন্য কোনো কাজ নিয়ে কথা হয়েছে।

কারণ এই ধরনের আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াড শুধু একটা লিখিত পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এখানে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক রাউন্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্প, তথ্য বিশ্লেষণ এবং দলগত কাজও থাকে। প্রতিটি অংশই গুরুত্বপূর্ণ।

ফলে শুধু একটা বিষয়ে ভালো প্রস্তুতি থাকলেই হয় না। পুরো প্রতিযোগিতার কাঠামো বুঝে প্রস্তুতি নিতে হয়।

আরেকটা চ্যালেঞ্জ ছিল দূর থেকে সবকিছু সমন্বয় করা। আমি সরাসরি দলের সঙ্গে উপস্থিত ছিলাম না, তাই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং তাদের সমস্যাগুলো বোঝার জন্য অনলাইনের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।

অনেক সময় একটা বিষয় বোঝাতে বেশ সময় লেগেছে। আবার কখনো শিক্ষার্থীদের নিজেদের মধ্যেও আলোচনা করে সমাধান বের করতে উৎসাহিত করেছি।

অবশ্য এই দায়িত্বটা একা পালন করা সম্ভব হতো না। আমাদের অন্য সদস্য এবং সহকর্মীদের সহযোগিতা ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে সময় ব্যবস্থাপনাই সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন অংশ ছিল। নিজের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি রাখতে চাইনি, আবার দলের প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও যতটা সম্ভব অবদান রাখতে চেয়েছি।

৮. প্র্যাকটিক্যাল রাউন্ডে উন্নত প্রযুক্তির সরঞ্জামের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও কেবল মেধা ও নিখুঁত পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা দিয়ে প্রতিযোগিতায় লড়াই করার অভিজ্ঞতাটি কেমন ছিল?

আমি নিজে দুটি আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ করেছি। একটি ওপেন ইন্টারন্যাশনাল বায়োলজি অলিম্পিয়াড এবং অন্যটি ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিয়াড অন ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইস্যুজ।

দুটোর বিষয়বস্তু আলাদা হলেও আমার কাছে প্রতিযোগিতা দুটির মধ্যে অনেক মিল ছিল। একটি মূলত জীববিজ্ঞান ভিত্তিক, অন্যটি পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ, পর্যবেক্ষণ এবং ব্যবহারিক দক্ষতার গুরুত্ব রয়েছে।

আমার কাছে সবচেয়ে কঠিন অংশগুলোর একটি ছিল ব্যবহারিক পরীক্ষা।

কারণ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এমন অনেক যন্ত্রপাতি বা পরীক্ষাগার ভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, যেগুলোর সঙ্গে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা সব সময় পরিচিত নয়।

আমাদের দেশে অনেক শিক্ষার্থী তাত্ত্বিকভাবে বেশ ভালো প্রস্তুতি নিতে পারে, কিন্তু নিয়মিত আধুনিক পরীক্ষাগারে কাজ করার সুযোগ পায় না। ফলে কোনো একটা বৈজ্ঞানিক বিষয় ভালোভাবে জানা থাকলেও সেটার ব্যবহারিক প্রয়োগে সমস্যায় পড়তে হয়।

আমার নিজের অভিজ্ঞতাতেও এই পার্থক্যটা অনুভব করেছি।

তবে ব্যবহারিক পরীক্ষায় শুধু যন্ত্রপাতি ব্যবহার করাটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়। আপনি কী পর্যবেক্ষণ করছেন, সেই পর্যবেক্ষণ থেকে কী বুঝতে পারছেন এবং প্রাপ্ত তথ্যকে কীভাবে বিশ্লেষণ করছেন, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সীমিত সুযোগের মধ্যেও আমাদের শিক্ষার্থীদের এই দক্ষতাগুলো কাজে লাগাতে হয়।

তবে আমি এটাও মনে করি, শুধু মেধা দিয়ে সব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও ভালো করতে হলে আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক পরীক্ষাগার এবং হাতে-কলমে বিজ্ঞান শেখার সুযোগ বাড়ানো জরুরি।

৯. প্রজেক্ট রাউন্ডে সরাসরি সংরক্ষিত বনভূমিতে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ এবং তথ্য বিশ্লেষণের সেই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন।

আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও জলবায়ু অলিম্পিয়াডের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, এখানে শুধু বইয়ের জ্ঞান যাচাই করা হয় না। বাস্তব পরিবেশে গিয়ে পর্যবেক্ষণ, তথ্য সংগ্রহ এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের সুযোগও থাকে।

সংরক্ষিত বনভূমিতে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে কাজ করার মতো প্রকল্পগুলো আমার কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ ধরনের কাজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রকৃত গবেষণার কিছু মৌলিক ধাপের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে।

তবে এবারের প্রতিযোগিতায় আমি সরাসরি মাঠপর্যায়ে উপস্থিত ছিলাম না। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার কারণে দেশ থেকেই দলের প্রস্তুতি এবং একাডেমিক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম।

তাই মাঠপর্যায়ে নমুনা সংগ্রহের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাটা আসলে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের। আমি মূলত তাদের প্রস্তুতি এবং এ ধরনের বৈজ্ঞানিক কাজের পদ্ধতিগত বিষয়গুলো নিয়ে সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি।

এই ধরনের প্রজেক্টে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি। শুধু কিছু নমুনা সংগ্রহ করলেই একটা গবেষণা সম্পন্ন হয় না। কেন সেই নমুনা নেওয়া হচ্ছে, কীভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করা হবে এবং সেই তথ্য থেকে কী ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব, এগুলো বুঝতে হয়।

একই সঙ্গে পরিবেশগত গবেষণায় সতর্কতা এবং দায়িত্বশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ।

আমার মনে হয়, এ ধরনের প্রকল্প শিক্ষার্থীদের বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনাকে আরও বাস্তবমুখী করে তোলে। কারণ এখানে তারা শুধু আগে থেকে জানা কোনো উত্তর খুঁজছে না, বরং নিজের পর্যবেক্ষণ এবং তথ্যের ভিত্তিতে একটা সমস্যাকে বোঝার চেষ্টা করছে।

১০. জলবায়ু ও পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় কাজ করতে আপনি ‘সাস্টেইনেবিলিটি অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সেস নেটওয়ার্ক’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই সংগঠনের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য কী?

সাস্টেইনেবিলিটি অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সেস নেটওয়ার্ক বা এসএলএসএন প্রতিষ্ঠার পেছনে আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল এমন একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যেখানে বিজ্ঞান, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং টেকসই উন্নয়ন নিয়ে আগ্রহী তরুণেরা একসঙ্গে কাজ করতে পারবে।

আমরা শুরু থেকেই চাইছিলাম, আমাদের কার্যক্রম যেন শুধু অলিম্পিয়াড আয়োজন কিংবা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং ভবিষ্যতে গবেষণা, শিক্ষামূলক কার্যক্রম, পরিবেশ সচেতনতা এবং সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়।

এসএলএসএনকে আমরা মূলত একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলছি।

তবে আমাদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে একটা বিষয় পরিষ্কার করে বলতে চাই। আমরা এখনও খুব বড় কোনো সংগঠন নই। আমাদের দল তুলনামূলকভাবে ছোট, আর এই ছোট দল নিয়েই এখন পর্যন্ত বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছি।

বর্তমানে আমরা সংগঠনটির আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছি। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আইনগতভাবে স্বীকৃত একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আরও বড় পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনা করা।

আমরা চাই দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে। ভবিষ্যতে সুযোগ তৈরি হলে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও পরিবেশ, শিক্ষা, গবেষণা এবং টেকসই উন্নয়ন নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়ন এবং অন্যান্য সহযোগিতা পাওয়ার সম্ভাবনাও আমরা তৈরি করতে চাই।

তবে এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে দক্ষ এবং আগ্রহী মানুষদের নিয়ে একটা শক্তিশালী দল গড়ে তোলা।

এ কারণে বর্তমানে আমরা নতুন সদস্য এবং স্বেচ্ছাসেবক যুক্ত করার চেষ্টা করছি। শুধু বিজ্ঞান বা পরিবেশ নিয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থী নয়, যারা গবেষণা, যোগাযোগ, সাংগঠনিক কাজ, প্রকল্প পরিচালনা কিংবা সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত হতে চায়, তাদের জন্যও ভবিষ্যতে সুযোগ তৈরি করতে চাই।

আমার ইচ্ছা, এসএলএসএন যেন শুধু আমাদের কয়েকজনের উদ্যোগ হয়ে না থাকে। বরং ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তরুণদের নিয়ে একটা কার্যকর নেটওয়ার্কে পরিণত হয়।

আমরা এখনও শুরুর পর্যায়ে আছি। তাই এখনই খুব বড় কিছু দাবি করতে চাই না। তবে দীর্ঘমেয়াদে সংগঠনটিকে এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই, যেখানে আমরা বাস্তব সমস্যা নিয়ে কাজ করতে পারব এবং সেই কাজের একটা ইতিবাচক প্রভাব সমাজে দেখতে পাব।

১১. জাতীয় পর্যায়ে প্রায় চার হাজার শিক্ষার্থী বাংলাদেশ জলবায়ু অলিম্পিয়াড ২০২৬-এর জন্য আবেদন করেছিল। দেশের তরুণদের মাঝে পরিবেশ ও জলবায়ুর সচেতনতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এসএলএসএন কীভাবে ভূমিকা রাখছে?

প্রায় চার হাজার শিক্ষার্থীর আবেদন আমাদের জন্য অবশ্যই অনেক বড় একটা অনুপ্রেরণা। কারণ এই সংখ্যাটা দেখায় যে বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ নিয়ে জানার যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে। আমাদের কাজ হচ্ছে সেই আগ্রহটাকে একটা সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া।

আমরা অনেক সময় জলবায়ু পরিবর্তনকে শুধু তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বন্যা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখি। কিন্তু এর প্রভাব আরও অনেক বিস্তৃত। মানুষের জীবনযাত্রা, কৃষি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, এমনকি সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গেও জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশের তরুণদের জন্য এসব বিষয় সম্পর্কে জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সাস্টেইনেবিলিটি অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সেস নেটওয়ার্ক এবং জিরো কম্পিটিশনস যৌথভাবে বাংলাদেশ জলবায়ু অলিম্পিয়াড আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই বিষয়গুলো নিয়ে আগ্রহ তৈরি করার চেষ্টা করছে। আমরা চাই শিক্ষার্থীরা শুধু প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ কিংবা পদক অর্জনের উদ্দেশ্যে না এসে, বাস্তব পরিবেশগত সমস্যাগুলো সম্পর্কে জানুক এবং সেগুলো নিয়ে নিজেরা চিন্তা করতে শিখুক।

পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মেধাবী ও আগ্রহী শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে তাদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করাও আমাদের অন্যতম উদ্দেশ্য।

তবে আমাদের পরিকল্পনা শুধু অলিম্পিয়াড আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভবিষ্যতে এসএলএসএনের মাধ্যমে পরিবেশবিষয়ক গবেষণা, সচেতনতামূলক কার্যক্রম, শিক্ষামূলক কর্মশালা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে।

আমাদের সংগঠন এখনও তুলনামূলক ছোট পরিসরে কাজ করছে। কিন্তু আমরা চাই ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থী ও তরুণদের এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করতে।

আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, একজন শিক্ষার্থী যেন জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে শুধু পরীক্ষার জন্য না পড়ে, বরং বুঝতে পারে এই সমস্যাগুলোর সঙ্গে তার নিজের জীবন এবং ভবিষ্যতের সম্পর্ক রয়েছে। সেই সচেতনতা তৈরি করতে পারাটাই আমাদের বড় সাফল্য হবে।

১২. সম্প্রতি যমুনা টেলিভিশনে আপনার সাক্ষাৎকার প্রচারের পর কেমন সাড়া পাচ্ছেন? সহপাঠী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জুনিয়রদের মধ্যে এটি কেমন প্রভাব ফেলছে?

আসলে ছোটবেলা থেকেই সাংবাদিকতা এবং টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা রয়েছে। বেশ ছোট বয়স থেকেই সাংবাদিকতার কাজ করেছি, পরবর্তী সময়ে খণ্ডকালীনভাবেও কাজ চালিয়ে গেছি। যদিও বর্তমানে কিছুটা বিরতিতে আছি। তাই ক্যামেরার সামনে কথা বলা কিংবা টেলিভিশনে নিজের উপস্থিতি দেখার বিষয়টা আমার কাছে খুব একটা নতুন নয়।

সত্যি বলতে, এখন এসব নিয়ে আলাদা করে খুব বেশি উত্তেজনা কাজ করে না। কারণ দীর্ঘদিন ধরে গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে বিষয়টা অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে।

তবে এবারের সাক্ষাৎকারের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে সহপাঠী, সিনিয়র এবং জুনিয়রদের কাছ থেকে বেশ ভালো সাড়া পেয়েছি। অনেকেই সাক্ষাৎকারটি দেখে প্রশংসা করেছেন, অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং আমার কাজ সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

এই বিষয়টা অবশ্যই ভালো লাগে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিত মানুষগুলো যখন আমার কাজকে ইতিবাচকভাবে দেখেন কিংবা সেটা নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেন, তখন নিজেরও একটা ভালো লাগা কাজ করে।

আমার মনে হয়, এসব সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষার্থীরাও আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াড, গবেষণা কিংবা পরিবেশবিষয়ক কাজে যুক্ত হতে আগ্রহী হয়, তাহলে সেটা আরও ভালো একটা ব্যাপার।

১৩. এই সামগ্রিক পথচলা ও অর্জনের পেছনে পরিবারের সমর্থন, শিক্ষক ও দলের সহযোদ্ধাদের অবদানকে আপনি কীভাবে দেখেন?

আমার মনে হয়, একজন মানুষের কোনো অর্জনের পেছনে শুধু তার নিজের পরিশ্রম থাকে না। সেখানে অনেক মানুষের সহযোগিতা, বিশ্বাস এবং অবদান থাকে।

আমার পরিবার ছোটবেলা থেকেই আমাকে বিভিন্ন বিষয়ে আগ্রহী হতে এবং নতুন কিছু চেষ্টা করতে উৎসাহ দিয়েছে। সব সময় হয়তো আমার কাজের প্রতিটা বিষয় তাদের কাছে পরিচিত ছিল না, কিন্তু তারপরও তারা আমার পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন।

বিশেষ করে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সময় বিভিন্ন অনিশ্চয়তা এবং আর্থিক চাপের মধ্যেও পরিবারের সমর্থন আমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আমার শিক্ষকদের অবদানও অবশ্যই উল্লেখ করতে চাই। বিভিন্ন সময় তাদের পরামর্শ এবং উৎসাহ আমাকে অনেক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছে।

এ ছাড়া সাংবাদিকতা, সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতাগুলোও আমার শেখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

আর অলিম্পিয়াড বা সাংগঠনিক কাজের ক্ষেত্রে আমার সহকর্মী এবং বন্ধুদের অবদান অনেক বড়।

বাইরে থেকে হয়তো কোনো একজনের নাম বেশি সামনে আসে, কিন্তু বাস্তবে একটা প্রতিযোগিতা আয়োজন করা কিংবা একটা দলকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রস্তুত করার পেছনে অনেক মানুষের পরিশ্রম থাকে।

আমাদের অনেকেই নিজেদের পড়াশোনা এবং অন্যান্য দায়িত্বের পাশাপাশি সময় দিয়ে কাজ করি। অনেক সময় গভীর রাত পর্যন্ত আলোচনা করতে হয়, সমস্যা সমাধান করতে হয় কিংবা পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হয়।

সবকিছু সব সময় সহজভাবে হয় না। কিন্তু দলগতভাবে কাজ করতে গিয়ে অনেক কিছু শেখার সুযোগ হয়।

আমি মনে করি, আমার নিজের যতটুকু অর্জন রয়েছে, তার পেছনে পরিবার, শিক্ষক এবং সহযোদ্ধাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।

১৪. ভবিষ্যতে গবেষণা বা পরিবেশগত টেকসই উন্নয়নে নিজের মেধাকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব বজায় রাখতে আপনার পরিকল্পনা কী?

ভবিষ্যতে আমি মূলত গবেষণা, পরিবেশ এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হতে চাই।

বিশেষ করে পরিবেশগত সংকট এবং মানুষের জীবনযাত্রার মধ্যে যে সম্পর্ক রয়েছে, সেটা নিয়ে কাজ করার আগ্রহ আমার অনেক দিনের।

আমি মনে করি, আমাদের দেশে জলবায়ু পরিবর্তন বা পরিবেশগত সমস্যাগুলো নিয়ে গবেষণা করতে গেলে শুধু প্রাকৃতিক পরিবর্তনের দিকটা দেখলেই হবে না। এসব পরিবর্তনের কারণে মানুষের জীবন, জীবিকা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তার ওপর কী প্রভাব পড়ছে, সেটাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকল্যাণ নিয়ে পড়াশোনা এবং অন্যদিকে বিজ্ঞান ও পরিবেশবিষয়ক কাজে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা আমাকে এই দুটি ক্ষেত্রকে একসঙ্গে দেখার সুযোগ দিয়েছে।

ভবিষ্যতে এমন কিছু গবেষণা করতে চাই, যেখানে বৈজ্ঞানিক তথ্য এবং সামাজিক বাস্তবতাকে একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে।

একই সঙ্গে এসএলএসএনকে একটা কার্যকর অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। আমরা এখন সংগঠনটির নিবন্ধন প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছি এবং ধীরে ধীরে আমাদের জনবল ও কার্যক্রম বাড়ানোর চেষ্টা করছি।

ভবিষ্যতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা এবং সুযোগ পেলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে চাই।

আমার আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াড এবং গবেষণার সুযোগ আরও সহজলভ্য করে তোলা।

আমি নিজে আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে অংশ নেওয়ার সময় যেসব সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছি, সেগুলো সম্পর্কে আমার ধারণা আছে। তাই চাই ভবিষ্যতে অন্য শিক্ষার্থীদের যেন একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে না হয়, অথবা অন্তত তারা যেন প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা এবং সহযোগিতা পায়।

এখন আমার কাছে শুধু নিজে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অংশগ্রহণ করাটাই একমাত্র লক্ষ্য নয়। বরং এমন একটা পরিবেশ তৈরি করার ইচ্ছা রয়েছে, যেখানে আরও অনেক তরুণ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করার সুযোগ পাবে।

তবে আমি এখনও নিজেকে শেখার পর্যায়েই মনে করি। অনেক কিছু করার ইচ্ছা আছে, কিন্তু একই সঙ্গে জানি যে এগুলো বাস্তবায়নের জন্য অনেক সময়, পরিশ্রম এবং অভিজ্ঞতা প্রয়োজন।

তাই আপাতত নিজের পড়াশোনা, গবেষণার প্রস্তুতি এবং সংগঠনের কার্যক্রমকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিতে চাই।

ভবিষ্যতে যদি আমার কাজের মাধ্যমে বাংলাদেশের গবেষণা, পরিবেশ কিংবা তরুণদের জন্য কিছু সুযোগ তৈরি করতে পারি, তাহলে সেটাই আমার কাছে বড় একটা অর্জন হবে।