ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবের বিরুদ্ধে নেকাব পরা এক ছাত্রীকে ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট’ (মৌলবাদী) ও ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একইসঙ্গে ওই ছাত্রীকে নিয়ে ‘জঙ্গি’ বা ‘বোমা হামলা করতে পারেন’—এমন মন্তব্য করার অভিযোগও করেছেন শিক্ষার্থীরা। এ ঘটনার প্রতিবাদে আজ রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে মানববন্ধন করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) দুপুর আড়াইটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

এর আগে বুধবার (৭ অক্টোবর) ইংরেজি বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের একটি মাস্টার্স ক্লাসে এ ঘটনা ঘটে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্লাসের শুরুতে নেকাব পরিহিত এক ছাত্রীকে সামনে বসা নিয়ে আপত্তি জানান অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুব। নেকাবের কারণে তিনি ‘আনকমফোর্টেবল’ ও ‘আনসেফ’ বোধ করছেন বলেও ওই শিক্ষক মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ করা হয়। পরে ছাত্রীকে পেছনে গিয়ে বসতে বলা হয়।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর ভাষ্য অনুযায়ী, পরিচয় নিশ্চিত করার প্রয়োজনে অফিস সময়ে মুখ দেখানো কিংবা পরিচয়পত্র দেখানোর প্রস্তাব দেওয়া হলেও শিক্ষক তা গ্রহণ করেননি। শিক্ষার্থীর দাবি, এর আগেও তার নেকাব ও পর্দা নিয়ে ওই শিক্ষক প্রশ্ন তুলেছিলেন।

ক্লাসে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নেকাব নিয়ে আলোচনা ও এক শিক্ষার্থীর প্রতিবাদের একপর্যায়ে ওই ছাত্রীকে ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট’ বা ‘সন্ত্রাসী’ নন—এটি কীভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়, এমন প্রশ্ন করা হয়। একইসঙ্গে নেকাব পরা কেউ ‘জঙ্গি’ হলে বা ‘বোমা মারলে’ কীভাবে তাকে সমর্থন করা যায়—এমন মন্তব্যও করা হয়েছে বলে শিক্ষার্থীরা দাবি করেন।

ঘটনার প্রতিবাদে প্রথমে নেকাব পরা ওই ছাত্রীসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী ক্লাস থেকে বের হয়ে যান। পরে অধিকাংশ শিক্ষার্থী ক্লাস বর্জন করে প্রতিবাদ জানান। এরপর বিষয়টি ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যানকে জানানো হয়।

বিভাগীয় সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পর ইংরেজি বিভাগের পক্ষ থেকে অভিযুক্ত শিক্ষককে সংশ্লিষ্ট মাস্টার্সের ক্লাস থেকে বিরত রাখার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে জরুরি একাডেমিক কমিটির সভায় অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবকে সব ধরনের ক্লাস থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে আজ প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. তাজিন আজিজ চৌধুরী জানান, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে এবং তাদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে একাডেমিক কমিটিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রক্টরকে স্মারকলিপি

এ ঘটনার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে একদল শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কার্যালয়ে স্মারকলিপি দেন। এতে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

স্মারকলিপিতে শিক্ষার্থীরা বলেন, পোশাক বা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো শিক্ষার্থীকে অবমাননাকর ভাষায় আখ্যায়িত করা গ্রহণযোগ্য নয়। একইসঙ্গে ব্যক্তিস্বাধীনতা, মর্যাদা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্য

ঘটনার বিষয়ে কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আবুল কালাম সরকার বলেন, প্রত্যেকের নিজের পছন্দ অনুযায়ী পর্দা করার অধিকার রয়েছে। কোনো শিক্ষক সত্যিই এ ধরনের মন্তব্য করে থাকলে তা উচিত হয়নি। লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানীও জানান, বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়কে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, অভিযুক্ত শিক্ষক তাসনিম সিরাজ মাহবুবের বক্তব্য জানতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোনে বিস্তারিত বক্তব্য দিতে রাজি হননি। একটি প্রতিবেদনে তিনি হাসপাতালে থাকার কথা জানিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আজ রাজু ভাস্কর্যে প্রতিবাদ

ঘটনার ধারাবাহিকতায় আজ দুপুরে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা নেকাব ও ধর্মীয় পোশাকের কারণে কোনো শিক্ষার্থী যেন বৈষম্য বা হেনস্তার শিকার না হন, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেন।

শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয় একটি মুক্ত ও বৈচিত্র্যময় শিক্ষাঙ্গন। সেখানে একজন শিক্ষার্থীর পোশাক, ধর্মীয় অনুশীলন বা ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে তাকে ‘মৌলবাদী’ কিংবা ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার অভিযোগ গুরুতর। তারা এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

এদিকে ঘটনাটি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মহলেও ব্যাপক আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমও ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযুক্ত শিক্ষককে একাডেমিক দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।

তবে অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে ঘটনার সব পক্ষের বক্তব্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফলের ওপরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে।