ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় বুধবার শুরু হয়েছে বামপন্থী ছাত্রসংগঠন বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর ১৭তম জাতীয় কাউন্সিল। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সার্বভৌমত্বকে কেন্দ্র করে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী এই কাউন্সিল চলবে ২৩ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
বুধবার দুপুর ১২টায় বটতলায় অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে কাউন্সিলের কার্যক্রম শুরু হয়। সংগঠনটির প্রকাশিত কর্মসূচি অনুযায়ী, উদ্বোধনী সমাবেশে উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের যোদ্ধা কমরেড রণজিৎ চট্টপাধ্যায়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি দিলীপ রায়।
এবারের কাউন্সিলের মূল স্লোগান, “শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সার্বভৌমত্বের লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ হও; সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও দেশীয় দালালদের উৎখাত করো!”
শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সংগঠনের বক্তব্য কাউন্সিল উপলক্ষে প্রকাশিত ঘোষণাপত্রে দেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনা ও দাবি তুলে ধরেছে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী।
সংগঠনটির দাবি, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোতে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। তাদের মতে, শিক্ষাব্যবস্থায় বাণিজ্যিকীকরণ ও বেসরকারিকরণ অব্যাহত রয়েছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত হয়নি।
ঘোষণাপত্রে আরও বলা হয়, শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে যাতে শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষের সন্তানদের জন্য শিক্ষার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। শিক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি এবং উচ্চশিক্ষা শেষে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তাকেও সংগঠনটি সংকট হিসেবে উল্লেখ করেছে।
কর্মসংস্থান ও শিল্পনীতি নিয়েও সংগঠনটি তাদের অবস্থান তুলে ধরেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়া এবং বিভিন্ন শিল্পে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ফলে বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও আয়-বৈষম্য বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে অবস্থান
ঘোষণাপত্রে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক, জ্বালানি খাত এবং জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়েও সংগঠনটি বিভিন্ন দাবি জানিয়েছে।
বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর অভিযোগ, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের শিক্ষা, শিল্প ও অর্থনৈতিক নীতি পরিচালিত হচ্ছে। একইসঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও চুক্তি নিয়েও সংগঠনটি আপত্তি জানিয়েছে।
১১ দফা দাবি ১৭তম জাতীয় কাউন্সিল উপলক্ষে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী মোট ১১ দফা দাবি উত্থাপন করেছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— ১. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেওয়া।
২. জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা।
৩. শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ করে সর্বজনীন, একমুখী ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন, শিক্ষাব্যবস্থাকে জাতীয়করণ এবং শিক্ষা শেষে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।
৪. নারীসহ সকল লিঙ্গপরিচয়ের মানুষের জন্য নিরাপদ রাষ্ট্র নিশ্চিত করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল গঠন।
৫. সংগঠনটির ভাষায় ‘গণবিরোধী’ মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিল এবং দেশের জাতীয় সম্পদ ও বন্দর বিদেশি শক্তির কাছে ইজারা দেওয়ার বিরোধিতা করা।
৬. বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত গোপন চুক্তি প্রকাশ এবং আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা।
৭. বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মূল্য কমানো এবং এসব খাতে বেসরকারিকরণ বন্ধ করা।
৮. কৃষকদের স্বল্প সুদে ঋণ ও রাষ্ট্রীয়ভাবে কৃষি উপকরণ সরবরাহ এবং বাজার সিন্ডিকেট বন্ধ করে কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা।
৯. কলকারখানায় অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ এবং ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবি।
১০. রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল ও চিনিকল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়া বন্ধ করে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে চালুর দাবি।
১১. সকল জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিশ্চিত করা, পাহাড়ে সেনাশাসন প্রত্যাহার এবং মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা।
চার দশকের বেশি সময়ের সংগঠন
বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী ১৯৮০ সালের ৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় বিভিন্ন বামপন্থী ছাত্রসংগঠনের ঐক্যের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। ঐতিহাসিকভাবে সংগঠনটির প্রথম সভাপতি হিসেবে ফজলে হোসেন বাদশা এবং প্রথম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আতাউর রহমান ঢালি দায়িত্ব পালন করেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
সংগঠনটির সর্বশেষ ১৬তম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় ২০২৪ সালের মে মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায়। ওই কাউন্সিলের পর দিলীপ রায় সভাপতি এবং জাবির আহমেদ জুবেল সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৭তম জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে সংগঠনটি তাদের পরবর্তী রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মসূচি নির্ধারণ করবে বলে জানিয়েছে।