আমি কখনোই চাইনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যেতে – মুনজুরুল করিম

তালাশের মূল পরিকল্পনাকারী ও উপস্থাপক মুনজুরুল করিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকনোমিক্সে পড়াশোনা করেছেন ।DUTIMZ কে দেয়া একান্ত সাক্ষাতকারে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অনেক কথাই শেয়ার করেছেন । যা পর্ব আকারে প্রকাশ করা হবে , এর প্রথম পর্ব আজ প্রকাশিত হলোঃ

ছবি ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে সংগ্রিহীত

ছবি ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে সংগ্রিহীত

আমি জিয়া হলে থাকতাম।আমার রুম নম্বর ছিল ৫২৩। হলের ব্যাপারটা ছিল যে অ্যাটাচমেন্ট থাকতো এক রুমে আবার থাকা যেত আর এক রুমে। তো আমার অ্যাটাচ রুম ছিল হচ্ছে গিয়ে ৪২০ নম্বর রুমে। যা আর কি 420{মৃদু হাসি}, 420 তে কখনও উঠতে পারিনাই কারণ হচ্ছে যে ঐটা পলিটিকাল রুম ছিল।

৪২০ নাম্বার রুমের একটা ইন্টারেস্টিং ঘটনা আছে। ওখানে একজন ছাত্রনেতার খুন হয় ওখানে।  সেটা ঈদের পরের কোন একটা সময় ছিল। আমি যখন বাড়িতে ছিলাম ঐ সময়টাতে খুন হয়। পরে ওটার সাক্ষীর তালিকায় আমার নাম চলে আসে,যেহেতু আমার অ্যাটাচ ছিল।। আমি খুবই ভয়ে ভয়ে ছিলাম। আমি একজন সাধারণ ছাত্র যে কিনা পলিটিকস এর আশে পাশে যাইনা, মিছিল মিটিং থেকেও দূরে থাকি। যখন মিছিল শুরু হতো সেই সময়টাতে আমি কাপড় কাঁচতে শুরু করতাম যাতে মিছিলে যেতে না হয়। যখন আমাকে সাক্ষ্য দিতে ডাকা হল তখন আমি আসলে ভঁয়ে কাঁপছিলাম। সেই সময়ের যে প্রোক্টর স্যার ছিলেন, সে আমাকে অনেক সান্ত্বনা দিয়ে, সাহস দিয়ে, চা-টা খাওয়ায় আমার স্টেটমেন্ট নেয় ।

আমার জীবনের সবচেয়ে আবেগাপ্লুত/আহত জায়গা হচ্ছে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে আসা। আমি কখনোই চাইনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যেতে। আমি চেয়েছি সারা জীবন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর ছাত্র হয়ে থাকতে। থার্ড ইয়ার, ফোরথ ইয়ার এর দিকে কিংবা মাস্টার্স এর দিকে গিয়ে ছেলেরা খুব বোর ফিল করে যে কবে নিজে একটা চাকরি পাবো, কবে নিজে ইনকাম করবো। একটা সময় আমারও এরকম ছিল যে নিজে নিজে ইনকাম করা অর্থাৎ নিজের স্বাধীনতাটা কবে আসবে সেই অপেক্ষা করতাম। তখন খুবই বিরক্ত লাগতো ক্যাম্পাসে, কিন্তু যখন বুঝলাম যে আর মাত্র ৬ মাস আছে, তখন আমি কোথাও যেতাম না। শুধু হলের সামনে ঘাসের উপর বসে থাকতাম বা এমনি মল চত্বরে হাঁটতাম। তখন মাথায় এই চিন্তাটা ঘুরত যে আমাকে এই ক্যাম্পাস ছেড়ে যেতে হবে, এখান থেকে বের হলেই আমাকে বাসা খুঁজতে হবে, আমাকে পানির কষ্ট পেতে হবে, বিদ্যুৎ এর কষ্ট পেতে হবে। এত সহজ জীবন আসলে ক্যাম্পাসের, তা বাইরে বেরিয়ে আসলে বোঝা যায় যে কতটুকু ফাইট(যুদ্ধ) করতে হয়।

ক্যাম্পাসের পুরো সময়টুকুই আমার আনন্দের। মানে প্রত্যেক দিন যত কষ্টই হোক। ধরা যাক যে মাসের ২০ তারিখের দিকে টাকা পয়সার টানাটানি পরে যেত। পাশের বঙ্গবন্ধু হলে এক মামা ছিল সে বাকি খাওয়াতো । তো ওখানেই দেখা যেত যে মাসের সাত দিন আমি বাকি খাচ্ছি।ঐ জিনিসগুলো খুব মনে পরে। মানে সলভেন্সি(সচ্ছলতা) দিয়ে আসলে কখনও সুখ কেনা সম্ভব না। এখন আমি যে পরিমাণ সলভেন্ট (সচ্ছল), যে পরিমাণ মাচিউরড, সেটা দিয়ে এখন আমি আসলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়ার সেই মর্যাদাটা পাবোনা। ঐ বোকা সোঁকা থাকতে হবে, টানাটানি থাকতে হবে। ঐ সময়টা পুরোটাই হচ্ছে আনন্দের সময়। কষ্টগুলা মাঝে মাঝে আনন্দের অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন আমার দুঃখের স্মৃতি থাকতে পারে কিন্তু তা আমি মনে করতে চাইনা।আমার ব্যপার হচ্ছে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আমি কিভাবে আলাদা করে দেখি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার যারা বন্ধুবান্ধব ছিল। বিভিন্ন সময়ে আমরা তাঁদের কাছে যেতাম। তো তখন একটা বিষয় দেখতাম যে যখন অন্য বিশ্ববিদ্যালয় গুলো ঘুমিয়ে যায় তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জেগে থাকে বা জেগে ওঠে এরকমও বলা যায়।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাত ১ টার সময় গেলেও দেখা যেত কোথাও হতে গান ভেসে আসছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার দৃষ্টিতে সবার সবচেয়ে প্রিয় গান হচ্ছে “ও রে নীল দরিয়া”। তো এই সব মিলিয়ে একটা নস্টালজিক অবস্থা আরকি।

তবে দুঃখের স্মৃতি যদি বলি – আক্ষেপের জায়গা একটা আছে। একটা সময় মনে হতো যে টিচার(শিক্ষক) হতে পারলে খুব ভালো হতো। কিন্তু ততদিনে রেজাল্ট এর বারোটা বেজে গেছে।  এখনও দেখা যাচ্ছে যে বিভিন্ন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে যখন কোন প্রোগ্রাম হয়, ওরা এক্সপেরিয়েন্স(অভিজ্ঞতা) শেয়ার করতে চায়, আমাকে ডাকে, ডাকার সাথে সাথে আমি চলে যাই। ঐ শেয়ারিং এর জায়গাটা আমার ভালো লাগে। একটা সম্মানের জায়গা আর সবচেয়ে লাকি(ভাগ্যবান) মনে হয় ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়তে পারাটা। কারণ বিভিন্ন এলাকার বিচিত্র মানুষের সাথে চলার শিক্ষা দেয়। আমাদের ঢাকা ইউনিভার্সিটি একাডেমিক দিক ছাড়াও ঢাকা ইউনিভার্সিটির পরিবেশ এবং প্রত্যেক দিনের বেঁচে থাকা, প্রত্যেক দিনের টিকে থাকার যে শিক্ষা দেয় সেটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

অনুলিখনঃইসরাত জাহান তৃষা
সম্পাদনাঃমোঃখায়রুল বাশার
সাক্ষাতকার গ্রহণঃসাফাত কাদির,মোঃখায়রুল বাশার ,আনামুল ইসলাম টুটুল

Share Button
Print Friendly

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Close
Please support the site
By clicking any of these buttons you help our site to get better