পায়ে হেঁটে চা কন্যার দেশে  

unnamed (7)

 

তরুণ প্রজন্মের নিকট ভ্রমণ এখন খুবই জনপ্রিয়। সুযোগ পেলে তা কেউই হাতছাড়া করতে চায় না। আর চাইবেইবাকেন, ভ্রমণ যেমন ক্লান্ত মনে প্রশান্তি আনে তেমনি ভ্রমণের মাধ্যমে জানা যায় দেশ-বিদেশের অনেক অজানা কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। আর এই ভ্রমণ যদি হয় পায়ে হেঁটে তাহলে তো কথাই নেই!

স্কাউটিং একটি শিক্ষামূলক যুব আন্দোলন। লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল ১৯০৭ সালে ইংল্যান্ডে স্কাউটিং শুরু করেন। স্কাউটিং এর বয়োজ্যেষ্ঠ শাখা রোভার স্কাউট। রোভার স্কাউটিং এর সর্বোচ্চ অ্যাওয়ার্ড- `প্রেসিডেন্ট’স রোভার স্কাউট অ্যাওয়ার্ড’অর্জনের জন্য সেবা স্তরে পায়ে হেঁটে ১৫০ কিমি পথ পরিভ্রমণকরতে হয়। আর এই লক্ষেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রোভার স্কাউট গ্রুপের আমরা তিনজন রোভার স্কাউট(কাজী জুবায়ের হোসেন, মো. জাহিদুল ইসলাম ও মো. জাহানুর ইসলাম)গত ২৫-২৯ ডিসেম্বর ২০১৬ এই পাঁচ দিনে নরসিংদী সদর থেকে মৌলভীবাজার সদর পর্যন্ত ১৫০ কিমি পথ পায়ে হেঁটে পরিভ্রমণ করি।

২৫ ডিসেম্বর সকালে নরসিংদী সার্কিট হাউজ থেকে শুরু হয় আমাদের পদযাত্রা।পায়ে হেঁটে পথ চলতে চলতে দেখা মেলে নরসিংদীর বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা ও ভাস্কর্যের, যা আমাদেরকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়। সকাল শেষে দুপুর গড়িয়ে নেমে আসে সন্ধ্যা, ততক্ষণে ছয়টি পা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। প্রথম দিন ৩৩ কিমি পথ পাড়ি দিয়ে আমরা সন্ধ্যায় ভৈরব উপজেলা পরিষদে পৌছাই। শেষ হয় পায়ে হেঁটে পরিভ্রমণের প্রথম দিন।

ভৈরব উপজেলা পরিষদ ডাক বাংলোতে রাত্রিযাপন শেষে ২৬ ডিসেম্বর সকালে আমরা তিনজন দ্বিতীয় দিনেরপরিভ্রমণশুরু করি। এবারের গন্তব্য হবিগঞ্জের মাধবপুর, পথের দূরত্ব প্রায় ৩৭ কিমি।ভৈরব থেকে টানা ১৫ কিমি হেঁটে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিশ্ব রোড মোড়ে আমরা দুপুরের খাবারে সেরে নিই। দুপুরের খাবার শেষে কোন রকম সময় অপচয় না করে আমরা আবারহাঁটাশুরু করি। হাঁটছি তো হাঁটছি, তবু এ পথ যেন শেষ হয় না।আমরাও দমে যাবার নয়, অদম্য মনবল নিয়ে হাঁটা চালিয়ে গেলাম।পথে স্থানীয় লোকদের সাথে সাক্ষাৎ ঘটে, কৌতুহলী জনতা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে বিভিন্ন প্রশ্ন করে, জানতে চায় কি কারণে আমরা পায়ে হেঁটে এত দীর্ঘ পথ অতিক্রম করছি। আমরাও তাদের প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দেয়ার চেষ্টা করি। বিশেষ করে পরিধেয় স্যাশ (বিশেষ উত্তরীয়) সম্পর্কে জনতার কৌতুহলের শেষ নেই। দলনেতা কাজী জুবায়ের হোসেন ‘গাছ লাগাইপরিবেশ বাঁচাই’, পর্যবেক্ষক মো. জাহানুর ইসলাম ‘সবাই মিলে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ি’ এবং দিক-নির্দেশক মো. জাহিদুল ইসলাম ‘জাতীয় সম্পদের অপচয় রোধ করি’-শ্লোগান সম্বলিত স্যাশ বহন করে।দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসলে রাস্তায় সোডিয়াম বাতি জ্বলে উঠে, কৃত্রিম আলোয় সবাই পথ চলতে চলতে মাধবপুর উপজেলা পরিষদে পৌছে যাই, শেষ হয় পরিভ্রমণের দ্বিতীয় দিন।

unnamed (4)

২৭ ডিসেম্বরআগের দিনের ন্যায় খুব সকালেই শুরু করি আমাদের পদযাত্রা। গন্তব্য হবিগঞ্জ সদরের শায়েস্তাগঞ্জ। চলছি তো চলছি থামার কোন সুযোগ নেই, পা ছয়টি যখন আর চলতে চায় না তখন অল্প সময়ের জন্য বিশ্রাম গ্রহণ করি, তবুও আমরা লক্ষ্য থাকে অটুট-অবিচল। যত সময়যেতে থাকে তত আমাদের মনোবল বৃদ্ধি পায়, তখন আমাদের কাছে ৩০০ কিমিও তুচ্ছ মনে হতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় পৌছে যাই শায়েস্তাগঞ্জে। মনে দুশ্চিন্তাভরকরে, কারণ এখানে রাত্রিযাপনের কোন ব্যবস্থা আগে থেকে করতে পারিনি। তবে নিজেদের তাৎক্ষণিক প্রচেষ্টায় শায়েস্তাগঞ্জ সড়ক ও জনপদ উপ-বিভাগের পরিদর্শন বাংলোতে আমরা রাত্রিযাপনের সুযোগ পেয়ে যাই। সবাই স্বস্তিতে ঘুমিয়ে পড়ি- ক্লান্ত চোখগুলো কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বন্ধ হয়ে আসে।

২৮ ডিসেম্বর ভরদুপুরে আমরা চা কন্যার দেশে প্রবেশ করি। প্রবেশ পথে স্বাগতম লেখা সম্বলিত একটি ফলক আমাদেরকে বরণ করে নেয়। সেখান থেকে একটু এগিয়ে যেতেই দেখা মেলে চা কন্যা ভাস্কর্যের। আগে থেকে উপস্থিত জনতার ভিড় দেখে আমরা শঙ্কিত হই, মনে মনে ভাবি যে চা কন্যার সাথে ছবি তুলতে পারব তো! চা কন্যা আমাদের নিরাশ করেনি, উপস্থিত জনতাকে দ্রুত বিদায় দিয়ে সে আমাদের বরণ করে নেয়। আমরা একসাথে চা কন্যার সাথে ছবি তুলি, আর এই ছবি তোলার পালা চলতে থাকে বেশ খানিকটা সময় ধরে। ছবি তোলা শেষে আমরা চা কন্যার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হাঁটতে থাকি শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ অভিমুখে। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় কলেজ প্রাঙ্গণে পৌঁছালে আগে থেকে অপেক্ষমান স্থানীয় রোভাররা আমাদেরকে স্বাগত জানায় এবং শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ এর উপাধ্যক্ষ প্রফেসর আবুল কালাম আজাদ স্যার আমাদেরকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন। নৈশভোজে আন্তরিকভাবে আপ্যায়ন করে এখানকার রোভাররা আমাদের হৃদয় জয় করে নেয়। পরবর্তীতে শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ রোভার ডেনেই আমরা রাত্রিযাপন করি।

২৯ ডিসেম্বর সকালে ৫ম ও শেষদিনের পদযাত্রা শুরু হয় শ্রীমঙ্গল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সাথে সৌজন্য সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে। পরবর্তীতে বেলা ৩টায়মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ-এর অধ্যক্ষ স্যারের সাথে সৌজন্যসাক্ষাতেরমাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের পরিভ্রমণেরপরিসমাপ্তি ঘটে।৫ দিনের এই পরিভ্রমণে আমরা পায়ে হেঁটে ৫ জেলার ১৪টি উপজেলা অতিক্রম করি। এরপর আমরা বাস যোগে চলে যাই সিলেটেরহযরত শাহজালাল(রহঃ)-এর মাজার জিয়ারত করতে। মাজার জিয়ারতের পর রাত ১০টায়আমরা উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনেচড়ে ঢাকার উদেশে যাত্রা শুরু করি। ট্রেনটি ঢাকা অভিমুখেদুর্দান্ত গতিতেছুটতে থাকে আর আমাদের বিষণ্ন মন সমস্বরে গেয়ে উঠে- ‘এই পথ যদি শেষ না হয়, তবে কেমন হত তুমি বলতো’।

 

মো: জাহানুর ইসলাম
সিনিয়র রোভারমেট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রোভার স্কাউট গ্রুপ

 

সহযোগিতায়: মো. আল-আমিন
প্রাক্তন সিনিয়র রোভারমেট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রোভার স্কাউট গ্রুপ

 

Share Button
Print Friendly

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Close
Please support the site
By clicking any of these buttons you help our site to get better