প্রান্তির এক টুকরো অন্য রকম ভালোবাসার গল্প !

গোলাপি! কার্জনের পরিচিত মুখ। কিন্তু অনেকেই তার দুর্বল শরীর দেখে আৎকে উঠবে। কারণ, নামের মত সুন্দর না হয়ে এই কুকুরের গায়ের সব লোম ঝরে পরেছে প্যারাসাইটের কারণে। তবে আশার কথা হল সেখানে তার যত্ন নেয়ার জন্য রয়েছে তার মায়ের মত মমতাময়ী প্রান্তি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ থেকে সদ্য অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা শেষ করা কার্জনের সদা হাস্যোজ্জ্বল মুখ সাবরিনা সাব্বির প্রান্তি। কেবল যখন কোন আহত কুকুর বা বিড়াল দেখতে পায় তখন তাদের সেবা দিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ করে না তোলা পর্যন্ত তার মুখের হাসিটুকু মলিন হয়ে রয়। জ্বি হ্যা, প্রাণিদের প্রতি তার মমত্ববোধের তুলনা অপরিসীম। দুস্থ, বয়স্ক মানুষ আর ছিন্নমূল শিশুদের সাহায্যের পাশাপাশি তার এই পশুপাখির প্রতি ভালবাসা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।

গাড়ির ধাক্কায় আঘাতপ্রাপ্ত কুকুর,বিড়াল কিংবা ঝড়ের বাতাসে আহত কোন পাখি কারোও সেবাতেই নেই তার কোন ত্রুটি। ক্যাম্পাসের কোথাও কোন অসুস্থ বা বেওয়ারিশ কুকুর বা বিড়াল পাওয়া গেছে শুনলেই ছুটে যান সেখানে আর উদ্ধার করে আনে মমতাময়ী মায়ের মত।কার্জনের অনেকের কাছেই তাই তিনি পরিচিত এসব অনাথ প্রাণিদের মা হিসেবে। জহির ভাইয়ের দোকান থেকে শুরু করে কার্জনের গেইট পর্যন্ত তাই অনেকেই তাকে সাহায্য করে ক্যাম্পাসে থাকা বিভিন্ন বেওয়ারিশ কুকুর,বিড়াল নিয়ে।

সাবরিনা সাব্বির প্রান্তি

সাবরিনা সাব্বির প্রান্তি

কীভাবে সবকিছুর শুরু জানতে চাইলে জানা যায়, ভেটেরিনারি সায়েন্স অর্থাৎ পশু চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়ার ইচ্ছা থাকলেও ভাগ্যক্রমে চলে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে। দুই ভাইবোনের মাঝে বড় প্রান্তির প্রাণিদের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টির কেন্দ্রে রয়েছে তার পরিবার। ছোটবেলায় বাবা মায়ের অনুপ্রেরণায় পোষা বিড়াল থেকেই প্রাণিদের প্রতি তৈরি হয় প্রবল আগ্রহ। বাবা,মায়ের আদর্শে  বেড়ে ওঠা প্রান্তির সেবাতালিকায় তাই বাদ যায়না রাস্তায় অবহেলায় পরে থাকা কুকুর,বিড়াল কিংবা আহত পাখি। তাইতো এসব নিরীহ প্রাণিদের দরকারে তাদের উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদানে তিনি ছুটে যান পশুবিশেষজ্ঞের কাছে।

কার্জন হল এলাকায় একদিন এক আহত কুকুর ছানার শোচনীয় অবস্থা প্রান্তিকে মর্মাহত করে। আর সেই কুকুরছানার যত্ন নেয়ার মাধ্যমেই শুরু হয় তার কার্জনের এই নিষ্পাপ প্রাণিদের প্রতি সেবা। Stray Dogs বা বেওয়ারিশ কুকুর বিষয়ক এক বিভাগীয় সেমিনার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তার পাঠানো লিখিত আবেদন কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৬ সালে প্রথমবারের মত প্রাণিবিদ্যা বিভাগের উদ্যোগে কার্জন হল এলাকায় ভ্যাক্সিনেশন প্রোগ্রামের আয়োজন করা হয়।

প্রান্তির সেবার পথে সহযোগী রয়েছে অনেকেই। প্রান্তি জানান তার এই পথচলায় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান ড: মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলাম স্যার ও বিভাগীয়  শিক্ষিকা গাওসিয়া ওয়াহিদুন্নেসা চৌধুরীর ভূমিকা অনস্বীকার্য।  মৃত্তিকা,পানি ও পরিবেশবিজ্ঞানের শর্মীর পাশে থাকা তাকে জুগিয়েছে সাহস আরও সামনে এগিয়ে যেতে। এছাড়া, নিজ বিভাগের সহপাঠী, জুনিয়র ও অন্যান্য প্রকৃতি সম্বন্ধীয় ক্লাবের সদস্য আর ক্যাম্পাসের অনেকেই এগিয়ে আসে তার সাহায্যে।

বর্তমানে প্রান্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ক্লাবের সেক্রেটারি হিসেবে তরুণদের পথ দেখাচ্ছে। এবছর এই ক্লাবের অধীনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাখিমেলা ও প্রজাপতি মেলায় অংশগ্রহণ করে। প্রান্তির আশা প্রতিবছর তাদের ক্লাবের মাধ্যমে ক্যাম্পাসের সব বেওয়ারিশ প্রাণিগুলোর জন্য ভ্যাক্সিনেশন প্রোগ্রাম আয়োজন করা হবে।

প্রান্তির কাছে জানা যায়, ক্যাম্পাসের এই বেওয়ারিশ কুকুরগুলো মূলত গার্ড ডগ বা পাহারাদার প্রজাতির কুকুর। সিকিউরিটি গার্ডদের ট্রেনিং প্রাপ্ত এই কুকুরগুলোও তাই প্রতি রাতেই তাদের সাথে পাহারা দিচ্ছে পুরো ক্যাম্পাসএলাকা আর  কার্জন হল এলাকার ল্যাবগুলোর অনেক দামি যন্ত্রসামগ্রী। তাই,এসব প্রাণি নামে বেওয়ারিশ হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তুতন্ত্রে রাখছে গুরুত্ববহ ভূমিকা।

মানবকল্যাণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবদান সবারই জানা। প্রান্তির অাশা তার এই কাজ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য এলাকায় শিক্ষার্থীরা কিছুটা স্নেহ, কিছু খাবার, সম্ভব হলে এদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে মানুষের পাশাপাশি এই নিষ্পাপ প্রাণিদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে।

“জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর” ছোটবেলায় শেখা এই মূলমন্ত্র ধারণ করা প্রান্তির অাশা এই উক্তিকে বিশ্বাস করে সবাই যেমন মানুষের সেবা করবে,তেমনি যেন অসহায় কুকুর,বিড়াল কিংবা পাখির সেবা করতে মানুষ যেন কখনো কার্পণ্যবোধ না করে।

প্রাণিসেবায় সমমনা যেকোন বিভাগ ও বর্ষের শিক্ষার্থীকে তিনি সাদর আমন্ত্রণ জানান এমন মহৎকাজে যদি তারা কেও অংশগ্রহণ করতে চায়। কারণ, একমাত্র সবার সমবেত সহযোগিতার মাধ্যমেই এই মহৎ কাজ সফল করা সম্ভব। ক্যাম্পাসের এসব প্রাণিসহায়তা সংক্রান্ত যেকোন সহযোগিতা বা পরামর্শের জন্য আগ্রহী শিক্ষার্থীরা প্রান্তির সাথে যোগাযোগ করতে পারবে ইমেইল এর মাধ্যমে।

ইমেইল: sabrinasabbir.du@gmail.com

সাক্ষাতকার ঃ মারযানা আখতার সিন্থিয়া এবং সালেহীন কবির রিফাত

Share Button
Print Friendly

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Close
Please support the site
By clicking any of these buttons you help our site to get better