রোহিঙ্গা সমস্যার ইতিবৃত্ত (পর্ব-১)

বেশ কয়েকদিন আগে মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ২০১২ সালের পর পুনরায় রোহিঙ্গাদের উপর নতুন করে দমন-নিপীরণ শুরু হয়। ঘটনার সুত্রপাত গত অক্টোবরে। একদম সশস্ত্র আক্রমণকারী মায়ানমারের পুলিশের উপর হামলা চালায় এবং এতে নয় জন পুলিশ নিহত হয়। যদিও এর দায় কেউ স্বীকার করে নি, তবে মায়ানমারের সরকারী সুত্র বলছে এই হামলা রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের কাজ। তারা বাংলাদেশ সীমান্তে প্রায় ৬০ লাখ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করে। যার ফলশ্রুতিতে এই হামলা হয় বলে তাদের দাবি।

রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন রাখাইন রাজ্যে একটি সশস্ত্র দল যারা ৮০ বা ৯০ এর দশকে বেশ সক্রিয় ছিল। যাইহৌক বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় পুলিশের উপর এমন হামলার পর থেকেই এই দমন-নিপীরণের সূচনা। মায়ানমার টাইমসের মতে গত ৬ সপ্তাহে ৭০ জনেরও বেশি রোহিঙ্গাদের হত্যা করা হয়েছে, প্রায় ৫০০ জনকে কারাবরণ করতে হয়েছে এবং নতুন করে ৩০,০০০ এর মত রোহিঙ্গা বাস্তুহারা হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের স্যাটেলাইট ইমেজের মাধ্যমে দেখা যায় উত্তর রাখাইন রাজ্যে প্রায় ১৩০০ এর মত স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। মায়ানমার সরকার বা সেনাবাহিনী সেখানে মানবতা বিরোধী কার্যকলাপকে অস্বীকার করেছে বরাবরের মতই। তাঁরা বলছে এটা তাদেরই কাজ যারা সরকার এবং জনগনের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করতে চায়। তারা দায় স্বীকার করতে না চাইলেও, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে উত্তর রাখাইন রাজ্যের অবস্থা খুবই নাজুক। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, মিলিটারি গানশিপ দিয়ে আক্রমণ করা হচ্ছে, সাথে হত্যা, ধর্ষণ, গ্রেফতার ও নির্যাতন বেশ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, মিলিটারি গানশিপ দিয়ে আক্রমণ করা হচ্ছে, সাথে হত্যা, ধর্ষণ, গ্রেফতার ও নির্যাতন

গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, মিলিটারি গানশিপ দিয়ে আক্রমণ করা হচ্ছে, সাথে হত্যা, ধর্ষণ, গ্রেফতার ও নির্যাতন ছবিঃ রয়টার্স

এরপূর্বে ২০১২ সালের জাতিগত সহিংসতার বলি হয়েছিল লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। সমস্যার মূল কারন ১৯৮২ সালে প্রণীত নাগরিকত্ব আইন। যেখানে তারা মায়ানমারের নাগরিকত্ব সুবিধা হারিয়ে রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়। এরপর থেকে ছোটখাট অজুহাতে তাঁদের উপর অত্যচার নির্যাতন চলে। উদ্দেশ্য একদম পরিষ্কার যাতে তাঁরা মায়ানমার থেকে বের হয়ে অন্যত্র চলে যায়। কিন্তু  রোহিঙ্গারা সংখ্যায় নেহায়েত কম নয়। প্রায় দেড় মিলিয়ন রোহিঙ্গা মায়ানমারে বাস করছে। আরো লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এমনকি পাকিস্থানেও তাঁরা রাষ্ট্রপরিচয়হীন অবস্থায় বাস করছে।

রোহিঙ্গা শব্দের অর্থ রোহাঙ্গ এর বাসিন্দা। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় রাখাইনকে রোহাঙ্গ বলে উচ্চারণ করা হত। আরাকান রাখাইন রাজ্যের পূর্ব নাম। এটিও রাখাইন শব্দের বাংলা, আরবি কিংবা পর্তুগীজ অপভ্রংশ। যাইহৌক রোহিঙ্গা শব্দটিই গোটা মায়ানমারে একটি ট্যাবু। যেন এই নামে কোন জনগোষ্ঠীই পূর্বে বসাবস করত না। রোহিঙ্গাদের আরাকান বা রাখাইন রাজ্যে বাস করার দুই ধরনের তত্ত্ব আছে। কিছু কিছু পণ্ডিত মনে করেন রোহিঙ্গারা আসলে একটি মিশ্র জাতিগোষ্ঠী।মধ্যযুগে আরব ব্যবসায়ী, মুঘল, তুর্কী এবং বিশেষ করে বাঙ্গালী যারা উক্ত সময়ে সেখানে বসাবস করতে শুরু করে তাদেরই বংশধর হল আজকের রোহিঙ্গারা। আবার কেউ কেউ দাবি করেন যে বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে দাস ব্যবসায়ীদের হাত ধরে আরাকান বা রাখাইন রাজ্যে বসতি শুরু করে তারা।

দ্বিতীয় তত্ত্ব যেটি মায়ানমারের শাসক গোষ্ঠী বা রাখাইন রাজ্যের উগ্র বৌদ্ধবাদীরা বেশি দাবি করে, সেটি হলো, রোহিঙ্গারা আসলে বাঙ্গালী অভিবাসী বা অল্প কিছু সংখ্যক ভারতীয় যারা ব্রিটিশ শাসনামলে পাকিস্তান গঠনের পূর্বে রাখাইন রাজ্যে বসাবস করা শুরু করে। কারন তাদের ভাষা অনেকটা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার সাথে মিলে যায়।

হাজার হাজার রোহিঙ্গা তাদের নিজ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে অন্যত্র ছবিঃ রয়টার্স

হাজার হাজার রোহিঙ্গা তাদের নিজ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে অন্যত্র ছবিঃ রয়টার্স

নাগরিকত্ব আইন বলে যেসব জাতিগোষ্ঠী ১৮৮৩ সালের পর মায়ানমারে এসে বসাবস শুরু করেছে তাঁরা মায়ানমারের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হবে। যেহেতু তারা দাবী করে যে রোহিঙ্গারা ব্রিটিশ শাসনামলে রাখাইন রাজ্যে এসে বসাবস করা শুরু করেছে সে জন্য তাঁরা মায়ানমারের নাগরিক হবে না।

এভাবে তাঁদের নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে দমন পীড়ন করা হলেও ইতিহাস ভিন্ন কথাই বলে। আরাকানে মুসলিম, বিশেষ করে বাঙ্গালীদের উপস্থিতি বেশ পুরাতন। পঞ্চদশ শতাব্দীতে ম্রাউক উ সম্রাজ্যের কথা আমরা ইতিহাসে পাই। ১৪২০ সালে বাংলার সুলতানদের সহযোগীতায় দীর্ঘদিন বাংলায় নির্বাসনে থাকা রাজা নারামিখলা আরাকানে ম্রাউক উ সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। তাঁর সাথে চলে আসা বাঙ্গালীরা আরাকানে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে। বৌদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা বিভিন্ন ইসলামিক পদবী ব্যবহার করতে থাকেন। এক সময় বাংলার সালতানাতের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে বাংলার চট্টগ্রাম জনপদ তাঁদের দখলে চলে যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা নিজেদের সুলতান বলে মান্য করত। বড় বড় পদে বাঙ্গালী এবং মুসলিমদের নিয়োগ দানও করেছিল। এভাবে সেখানে বাঙ্গালীদের প্রভাব বাড়তে থাকে।

ফার্সিভাষায় ইসলামের কালেমা খোদাই করা মুদ্রাও সেখানে ব্যবহৃত হত। মুঘল আক্রমণে চট্টগ্রাম পুনরায় বাংলার শাসকদের হাতে চলে যায়। যাইহৌক এভাবেই সেখানে বাঙ্গালীদের প্রভাব কিংবা বসতি বাড়তে থাকে। আমরা মহাকবি আলাওলের কথা জানি। যিনি আরাকানের রাজসভায় দীর্ঘদীন ছিলেন। এটাও প্রমান করে সেখানে বাঙ্গালী উপস্থিতির কথা। পর্তুগীজ জলদস্যু বা মগ জলদস্যুরা বিপুল সংখ্যক বাঙ্গালীদের দাস হিসেবে আরাকানে নিয়ে যায়। সময়কালটা ১৫৩১-১৬২৯ সাল পর্যন্ত হবে। সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যে সেখানে বাঙ্গালী বা মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশ বেড়ে যায়।

_83059503_027229539-1

মায়ানমার টাইমসের মতে গত ৬ সপ্তাহে নতুন করে ৩০,০০০ এর মত রোহিঙ্গা বাস্তুহারা হয়েছে ছবিঃ এএফপি

সুতরাং এখানে মায়ানমারের সরকারের ভাষ্যটা মিথ্যা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ১৮৮৩ সালের পূর্বেই সেখানে আজ যারা রোহিঙ্গা বলে পরিচিত তাঁদের উপস্থিতি বিদ্যমান। তাঁরা মায়ানমারের নাগরিকত্ব পাবার দাবিদার হলেও তাঁদেরকে সে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

১৭৮৫ সালে ম্রাউক উ সম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং বার্মিজদের রাজার অধীনে চলে যায় পুরো আরাকান রাজ্য। রাখাইনরা সহ সেখানে বসতি স্থাপন করা মুসলিমদের একটি বড় অংশই বাংলায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এরপর যখন আরাকান ব্রিটিশদের অধীনে চলে যায় তখন পুনরায় তাঁরা প্রত্যাবর্তন করতে পারে। বার্মা পুরোপুরিভাবে ব্রিটিশদের অধীনে চলে গেলে সেই ধারা বৃদ্ধি পায়। মূলত এই সময়কালটাকেই মায়ানমারের শাসক গোষ্ঠীরা রোহিঙ্গাদের আগমনকাল বলে ধরে থাকে যা পুরোপুরিভাবে মিথ্যা। ব্রিটিশ লেখক ফ্রান্সিস হ্যামিলটনের ১৭৯৯ সালের প্রকাশিত নিবন্ধে তা প্রমাণিত হয়। সেখানে রোহিঙ্গাদের ব্রিটিশদের আগমনের পূর্বকাল থেকে বসতির কথা উল্লেখ করেছেন হ্যামিলটন।

zzzzযাইহোক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে বার্মা জাপানের অধীনে চলে যায়। কিন্তু ব্রিটিশরা ভি-ফোর্স গঠন করে সেখানে রোহিঙ্গারা অংশগ্রহণ করে। উত্তর আরাকান বা রাখাইন রাজ্যে তাঁরা একটি বাফার জোন প্রতিষ্ঠা করে। যেটা বার্মিজ বা রাখাইনরা মেনে নিতে পারে নি। কারন তাঁরা জাপানিজদের পক্ষাবলম্বন করেছিল। মায়ানমারে জাতিগত দাঙ্গা ও রোহিঙ্গা নির্যাতনের সূচনাটা এই সময়েই হয়েছিল।  রোহিঙ্গারা জাপানিজদের প্রতিরোধ করার পাশাপাশি আরাকান বা রাখাইন রাজ্যে গণহত্যা চালিয়েছিল। তাঁরা ১৯৪২ সালে প্রায় ৫০,০০০ রাখাইনদের হত্যা করেছিল। যা আরাকান গণহত্যা নামে পরিচিত। এর প্রতিশোধ হিসেবে বার্মিজ বৌদ্ধরাও জাপানিজদের সহযোগীতায় মুসলিম রোহিঙ্গাদের উপর গণহত্যা চালায়। তাঁদের একটি বড় অংশ পুনরায় বাংলায় ফিরতে বাধ্য হয়।

এই পাল্টাপাল্টি গণহত্যা ও জাতিগত বিদ্বেষই বর্তমান রোহিঙ্গা সমস্যার মূল কারন। রাখাইন বা বার্মিজ বৌদ্ধরা মুসলিম রোহিঙ্গাদের ব্রিটিশদের পক্ষ নিয়ে গণহত্যা চালানোকে সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখে এবং তখন থেকেই মূলত তাঁদের বার্মিজ ভূখন্ড থেকে বিতাড়িত করার দাবি করতে শুরু করে। (চলবে)

এসকে রিফাত

Share Button
Print Friendly

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Close
Please support the site
By clicking any of these buttons you help our site to get better