কিছু হৃদয়ের ক্ষত , রঙ্গিন আড্ডা অথবা এই ক্যাম্পাসে আমাদের বুড়িয়ে যাওয়ার গল্প !

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য ভর্তি হওয়া ছেলেমেয়েগুলোর স্বপ্নগুলো একটু বেশিই রঙ্গিন থাকে। এই রঙ্গিন সপ্নধারী ছেলেমেয়েদের পদচারনায় ঢাবি ক্যাম্পাস থাকে মুখরিত।

ঢাবি শুধুমাত্র একটি শিক্ষা অর্জনের জায়গাই নয়। এটা আমাদের আবেগের জায়গা, ভালবাসার জায়গা, অট্ট হাসিতে মেতে উঠার জায়গা, রাজত্ত করার জায়গা।

কার্জন হলের সামনের মাঠে বসে প্রান খুলে নিঃশ্বাস নেয়া, শহিদুল্লাহর পুকুর পাড়ের শীতল বাতাসে মনকে উদাস করে তোলা, টিএসসিতে গানের আসরে গিটারের তালে তালে বেসুরে গান গেয়ে উঠা, রুবেলের চায়ের দোকানে চা খেতে খেতে আড্ডায় মেতে উঠা, কখনও সিনেটে চুপচাপ বসে থাকা, এই সবকিছুই তখন জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠে।

টিএসসির এক টাকার চা, হাকিম চত্তরের খিচুরি, বিজ্ঞান ক্যাফেটেরিয়ার আণুবীক্ষণিক মুরগির মাংসের টুকরো, মধুর ক্যান্টিনের মিষ্টি, শহীদ মিনারের সামনের সেই ফুচকা, শ্যাডোও এর লেবুর সরবত এগুলো সব ই তখন ধীরে ধীরে অনেক বেশি আপন হয়ে যায়।

বন্ধুত্তটা এখানে বেশ তাড়াতাড়ি ই গড়ে ওঠে। কার্জনের এক প্রান্তে থাকা কোন ডিপার্টমেন্টের একটি ছেলের সাথে কলাভবন এর একটা ছেলের বন্ধুত্ত দেখে বুঝার উপায় নেই যে তারা ভিন্ন ভিন্ন ডিপার্টমেন্টের ছাত্র। একসাথে আড্ডা দিতে দিতে কখন যে এরা খুব কাছের বন্ধু হয়ে উঠে তা তারা নিজেরাও বুঝতে পারেনা।

যেকোনো উৎসব পালনে ঢাবির স্টুডেন্ট দের মধ্যে কোন কার্পণ্য থাকেনা। পহেলা বৈশাখ, বসন্ত বরণ, সরস্বতী পূজা, এরকম প্রতিটি ক্ষেত্রে ক্যাম্পাস এ পা না ছোঁয়ালে যেন উৎসবটাই মাটি হয়ে যায়। এখানকার সবার মধ্যে হাঁটাহাঁটির অভ্যাসটা বেশ ভালোভাবেই হয়ে যায়। কার্জন থেকে টিএসসি, টিএসসি থেকে কলাভবন, কলাভবন থেকে চারুকলা, কখনও ফুলার রোড কিংবা পলাশি; সব জায়গায় হাঁটতে হাঁটতেই ক্যাম্পাসের প্রতি মায়া আরও বেড়ে যেতে থাকে। কার্জনের লাল লাল দালানগুলো যেন স্বপ্নের রাজপ্রাসাদ। ক্যাম্পাসের প্রত্যেকটা ধুলিকনাই যেন এক অজানা মায়ার বাধনে আটকে রাখে সবাইকে।

ভার্সিটির বাস এ করে যাওয়া-আসা করার আনন্দ অন্যরকম। আবার হলে থাকা ছেলেমেয়েগুলোর বাধাহীন সংগ্রামপূর্ণ জীবনগুলো নিয়েও এক একটা গল্পের বই লিখে ফেলা যাবে।

ছেলেগুলোর বরাবরই সিনিয়র আপুদের প্রতি সিক্রেট ক্রাস থাকে। কিন্তু তারা সেটা প্রকাশ না করে ক্লাসমেট কিংবা জুনিওর মেয়েদের থেকেই জীবন সঙ্গীনি খুঁজতে থাকে। আবার একটি ফ্রেন্ড গ্রুপে থাকে এক এক রকমের মানুষ। কারও মুখের কথা লাফিং গ্যাসের মত কাজ করে, কেউ থাকে অনেক বেশি আবেগি, আবার কোন কোন মেয়ে দুষ্টুমির দিক থেকে ছেলেদের কেও হার মানায়। এখানে ছেলেমেয়েদের বন্ধুত্তটাও অন্যরকম।

তবে সবার মধ্যেই যে বহির্মুখী ভাব থাকে, তা নয়। কেউ একটু গম্ভির টাইপের হয়। মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করা, ক্লাস শেষ এ লক্ষ্মী ছেলেমেয়ের মত বাড়িতে ফেরা এসবই তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। তারাও প্রেমে পড়ে। কিন্তু তাদের সেই প্রেমগুল অপ্রকাশিত ই থাকে বেশিরভাগ সময়।

আবার সবসময় আড্ডায় মেতে ওঠা তরুণদের আবেগও কম নয়। তাদের কেউ প্রেম করে, কেউ প্রেমে পড়ে। এই প্রেমিয় মানুষগুলোকে কখনও দেখা যায় সুফিয়া কামাল হলের সামনে, কখনও টিএসসিতে, কখনও আমতলা বা বটতলায়। তবে মোহ থেকে জন্ম হওয়া প্রেমগুলো খুব সহজেই ভেঙ্গে যায়। আর কিছু প্রেম ভাঙ্গে বাস্তবতার নিষ্ঠুরতায়। ক্যাম্পাসের বেশিরভাগ সময় এ আবেগি মানুষেরা প্রেমের পিছনেই কাটিয়ে দেয়।

কিছু প্রেম সফলতার মুখ দেখলেও সেইম এজ এর বেশির ভাগ প্রেম ই সফলতার মুখ দেখতে পায়না। আবেগের চেয়ে এক সময় বাস্তবতা চোখের সামনে এসে ধরা দেয়। মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায় প্রতিষ্ঠিত কোন ছেলের সাথে। এরপর হয়ত ছেলেটি কিছুদিন দেবদাস হয়ে ঘুরে বেড়ায়। লোকচক্ষুর আড়ালে চোখের পানি মুছে ফেলে। কিন্তু কিছুদিন পর সে নিজেকে সামলে নেয় এবং সে তার ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে শুরু করে। সবসময় গানের আসরে থাকা ছেলেটাকে আজকাল লাইব্রেরীতে দেখা যায়। হাতে সিগারেটের বদলে বই নিয়ে ঘুরতে দেখা যায়। একসময় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সব অবলম্বন খুঁজে পেলেও সেই ভালোবাসার মানুষটিকে আর কাছে পাওয়া হয়না।

তবে প্রেম সফল হোক আর নাই হোক, ক্যাম্পাসের এই সৃতিগুলো মানুষ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভুলতে পারেনা। কিছু স্মৃতি হাসায়, কিছু সৃতি যন্ত্রণা দেয়, আবার কিছু সৃতি আঁকড়ে ধরে মানুষ বেঁচে থাকে।
এসবকিছু নিয়েই তো আমাদের ক্যাম্পাসের গল্প।

জান্নাতুন নাঈমা
চতুর্থ বর্ষ, মৃত্তিকা,পানি ও পরিবেশ বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Share Button
Print Friendly

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Close
Please support the site
By clicking any of these buttons you help our site to get better