আমরা আপনাকে কেন চাকুরি দেব?

আমরা আপনাকে কেন নিবো? বর্তমান তরুণ প্রজন্মের সব চেয়ে প্রচলিত প্রশ্ন সম্ভবত এটাই। কারণ আগের প্রজন্মগুলোর তুলনায় এই প্রজন্মে অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বীতা। প্রাতিষ্ঠানিক জীবন শেষে শুরু হয় চাকরির জন্য দৌড়। একথাটি এখন সবাইই জানে যে কাঙ্ক্ষিত চাকরির জন্য ভালো সিজিপিএ এবং কিছু আলাদা দক্ষতা লাগে যা পছন্দের চাকরি পেতে অনেক সাহায্য করে। এটাই ভালো চাকরি লাভের মূলমন্ত্র।1413830260-interview-questions

আপনি যে চাকরির জন্য যোগ্য তা আপনার প্রমাণ করতে হবে ভাইভা বোর্ডে। আপনি যতই ভালো ফলাফল নিয়ে শিক্ষাজীবন শেষ করেন না কেন, আপনি যদি তা প্রয়োগ করতে না পারেন তাহলে আপনার ভালো সিজিপিএর কোন মূল্য নেই। এই সব কিছু আপনার প্রমান করতে হবে ভাইভা বোর্ডে।

ভালো সিজিপিএ আপনাকে ভাইভা বোর্ডে ডাক পেতে সাহায্য করবে কিন্তু ওখানে গিয়ে নিজেকে প্রমাণের দায়িত্ব আপনার। বাস্তব জীবনের কিছু অভিজ্ঞতা আপনাকে বললে আপনি বুঝতে পারবেন যে ভাইভা বোর্ডে কেমন হতে হবে আপনার করনীয়।

সময় এর সঠিক ব্যবহার কর্মজীবনে আপনাকে অনেক দূরে নিবে। কোথাও ইন্টার্ভিউ দিতে গেলে কমপক্ষে ১৫ মিনিট আগে সেখানে পৌঁছে যাবেন। ইংরেজিতে একটা কথা আছে“First impression is the best impression”আপনার টাইম সেন্স শুরুতেই একটা ভালো ধারণা তৈরি করবে চাকরীদাতার মনে। কিন্তু সাবধান! আবার বেশি আগে ইন্টার্ভিউ দিতে চলে যাবেন না। তখন আপনি কর্তৃপক্ষের জন্য নিজেই বোঝা হয়ে যাবেন। আপনি ঠিক মত আছেন কিনা সে ব্যপারে তাদের আলাদা মাথা ব্যথা থাকবে। তাই ১৫ মিনিটের বেশি নয়, ১৫ মিনিটের আগে আসলে ভালো হয়।

ব্যক্তিত্ব অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি জিনিস নিজেকে আলাদা ভাবে মানুষের কাছে চেনানোর জন্য। কারণ একজন চাকরিদাতা একদিনে অন্তত ২০-৩০ এর ভাইভা নেয় এবং তাদের মধ্যে নিজেকে সবার থেকে আলাদা করা মার্কেটিং এর ভাষায় আমরা যাকে বলি POSITIONING। এই টার্ম এর সাথে এখন অনেকেই পরিচিত, বিশেষ করে বিবিএর স্টুডেন্টরা। বাকিদের মত আপনি এটা ভেবে ভাইভা বোর্ডে ঢুকবেননা যে আমার যেকোনো ভাবে চাকরি টা পেতে হবে। কারণ যারা নিয়োগকর্তা তারা আপনাকে ভাইভা বোর্ডে মুলত ডাকে এজন্য যে আপনার ব্যক্তিত্ব কেমন, আপনি কিভাবে কথা বলেন, কিভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারেন এগুলো। তারা আপনার অর্জন জানার জন্য আপনাকে ভাইভাতে ডাকেন না কারণ আপনার সব অর্জন আপনার সিভিতে আগেই দেয়া আছে। তারা আপনার সাথে কথা বলে আপনার মানসিকতা কেমন তা পরীক্ষা করেন। তাই ভাইভা বোর্ডে ঢুঁকে সবার আগে একটি ছোট হাঁসির সাথে অভ্যর্থনা জানাবেন। হাসি সবসময় সবার মনে একটা ভালো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তাই বলে মেকি হাসি আবার হাসবেন না। মন থেকে হাসি না আসলে হাসাই শ্রেয়। বর্তমানে সবাই একটা নীতি মেনে চলে তা হল“Sell Yourself”এভাবে অনেকেই কাজ পেয়ে যায় কিন্তু তা বেশি ফলপ্রসূ হয় না। তাই নিজেকে বিক্রি না করে নিজের গুনগুলি নিয়োগকর্তাদের সামনে তুলে ধরুন। তাদের চাহিদার সাথে আপনার দক্ষতা এবং গুণাবলী মিলে গেলে আপনার সাথে চাকরিদাতাদের একটা ভালো সম্পর্ক এমনেই হবে। এবং ইন্টার্ভিউ শেষে একটা ছোট ধন্যবাদ নোট চাকরিদাতার মনে ভালো ছাপ তৈরি করে আপনার ব্যপারে। এটা বোঝায় যে আপনার ওই প্রতিষ্ঠান এবং ওই প্রতিষ্ঠানের লোকদের প্রতি আগ্রহ আছে যা আপনাকে সবার মধ্যে আলাদা করে চেনাবে। তাই চেষ্টা করবেন যেন ভাইভার পর চাকরিদাতার মেইল-অ্যাড্রেস নিতে এবং একটা ছোট ধন্যবাদ বার্তা মেইলে পাঠাতে। এর চেয়ে বেশি কথা না বলাই ভালো নাহলে এটা বিরূপ প্রতিক্রিয়াও সৃষ্টি করতে পারে আপনার প্রতি।individual-interview-full

ড্রেসকোড আপনার ব্যক্তিত্বেরই একটি প্রতিচ্ছবি যা চাকরিদাতার মনে আপনার ব্যাপারে ভাল-মন্দ যেকোনো মনভাব তৈরি করতে পারে। নিজের একটা অভিজ্ঞতা বলতে পারি তা হল একবার আমি ইউনিভার্সিটির একটি ক্লাবে ভাইভে তে ক্যাসুয়াল কাপড় পড়ে যাই এবং তার খেসারত ছিল ওই ক্লাবে সুযোগ না পাওয়া। তাই ফর্মাল কাপড় সবখানেই অগ্রাধিকার পায়।

যেখানে কাজ করতে চান, সেখানকার পরিবেশ, রীতিনীতির ব্যাপারে ধারণা থাকা অত্যাবশ্যকীয় এবং এই আগ্রহটা আপনার নিজে থেকেই আস্তে হবে। চাকরিদাতাদের খুশি করার জন্য নয়। ধরুন, আপনি একটি মেয়েকে খুব পছন্দ। আপনি অবশ্যই ওই মেয়ের পছন্দ-অপছন্দ অবশ্যই মাথায় রাখবেন। এখানে আপনার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র নিজের প্রিয় মানুষকে খুশি দেখা। আপনি যেখানে ইন্টার্ভিউ দিতে যাবেন, সে জায়গার প্রতিও যদি আপনার এইরকম অনুভূতি থাকে, তাহলে আপনার কখনই ওখানকার কাজ বিরক্তিকর লাগবে না বরং আরও মজা লাগবে করতে। ভাইভা বোর্ডেও যদি আপনি সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতি নিজের আবেগটা তুলে ধরতে পারেন, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানও আপনাকে পরিবারের সদস্য হিসেবে মেনে নিবে।

মিথ্যা বলবেন, বাদ পড়বেন। কখনই নিজের সিভিতে আপনার দক্ষতা সম্পর্কে বারিয়ে চাড়িয়ে কিছু বলবেন না। যতদূর জানেন, অততুকুই উল্লেখ করবেন। কারণ, একদিন মিথ্যা ধরা পরবেই এবং তখন চাকরির বাজারে আপনি গুরুত্ব পাবেন না কারণ মানুষের বদনামের খবর থ্রিজি গতির চেয়েও দ্রুত ছড়ায়। আপনি যদি কিছু নাও পারেন এবং সততার সাথে স্বীকার করেন, আপনি এর প্রতিদান পাবেন।

একবার আমি একটি আন্তর্জাতিক মানের স্বেচ্ছাসেবক প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্ভিউ দিতে গিয়েছিলাম। আমরা সবসময় সেচ্ছসেবামূলক কাজ ভালো লাগে, তাই ওখানে কাজের জন্য যাওয়া। সেই প্রতিষ্ঠানের লোকেরা আমাকে জিজ্ঞাসা করে যে আমি ওয়েব ডিসাইনিং, গ্রাফিক ডিসাইনিং ইত্যাদি কাজ পারি কিনা। প্রত্যেকবার আমরা উত্তর না ছিল, এমনকি ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারেও আমরা ধারণা কিছুটা কম ছিল যা আমি স্বীকার করেছিলাম। ভেবেছিলাম তারা আমাকে নিবেন না কিন্তু ভাইভা শেষে তারা নিজেই আমাকে বলল যে আমি তাদের সাথে কাজের সুযোগ পেতে পারি। তারা মূলত আমরা সরলতাকে পছন্দ করেছিল যা তাদের প্রতিষ্ঠানের সাথে যায় কারণ তারা এমন মানুষ খুজছিল যারা নিজ আগ্রহেই কাজ করবে। তাই আমি সুযোগ পেয়েছিলাম। যদিও ভাইভা শেষে চাকরিদাতারা আমাকে বলেছিল যে সব জায়গায় সহজে নিজের কমতি তুলে ধরতে মানা। কারণ, সবার দৃষ্টিভঙ্গি এক না।

বেশি কথা কেউই পছন্দ করে না। সবাইই চায় যেন তাদের অন্যরা শুনে। তাই একজন চাকরিগ্রহীতা হিসেবে বলবেন কম, শুনবেন বেশি। অনেকের জন্য এটা কষ্টকর হতে পারে, কিন্তু এটাও ধৈর্যশীলতার পরিচয়। কারণ আপনি জত শুনবেন, তত ওখানকার পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন এবং দ্রুত ওখানকার পরিস্থিতি বুঝে ওখানে খাপখাওয়াতে পারবেন যে চাকরি পাওয়ার পর আপনার জন্য অনেক উপকারীই হবে অবশেষে।

প্রাসংঙ্গিক আলোচনা সর্বদা অগ্রাধিকার পায়। আপনি যদি হিসাব বিভাগের একটি পদের জন্য ভাইভা দিতে যান এবং মার্কেটিং নিয়ে আলোচনা শুরু করেন, আপনি নির্ঘাত হাসির পাত্র/পাত্রী হিসেবে খেতাব পাবেন। তাই আপনার দক্ষতা জেদিক, ওদিক ফুটিয়ে তুলুন। তাহলে চাকরিদাতা সহজে আপনার সঠিক গুরুত্ব বুঝতে পারবেন।

এগুলো হল কিছু পদক্ষেপ যা আপনাকে চাকরির বাজারের সফল খেলোয়াড় বানাতে সাহায্য করবে। কিন্তু এগুলোই শুধু নয়, আরও অনেক মন্ত্র আছে যা আপনাকে আরও পরিপূর্ণ কর্মচারী হিসেবে বাজারে পরিচিতি দিবে। তার জন্য আপনার যত সম্ভব নিজেকে দক্ষ, ব্যক্তিত্ববান এবং সর্বোপরি একজন ভালো মানুষ হিসাবে গড়ে তুলবে। এটা আপনার নৈতিক দায়িত্ব নিজেকে যত সম্ভব একজন সফল নয়, সার্থক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। কারণ, বর্তমানের তথাকথিত কর্পোরেটজগতে মানুষ শুধু কতটা সফল হতে পারে এবং নিজের গায়ে একটা প্রাইস লেবেল বসিয়ে পণ্য হিসেবে নিজেকে বিক্রির ধান্দায় থাকে। কিন্তু প্রকৃত সাফল্য আপনি কর্পোরেট দুনিয়াতে তখনই পাবেন যখন একজন সার্থক মানুষ হিসাবে আপনি নিজেকে সবার থেকে আলাদা করে তুলে ধরবেন। কারণ চাকরিদাতারা শুধু বিজ্ঞ এবং বহু প্রতিভার অধিকারী কর্মচারী খুজেন না, তারা মূলত সবকিছুর মুলে একজন নীতিবান মানুষ খোঁজেন।

কাজী তানভির আহমেদ

Share Button
Print Friendly

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Close
Please support the site
By clicking any of these buttons you help our site to get better