কীর্তিমানঃ নাসার বিজ্ঞানী ডঃ আব্দুস সাত্তার খান

যুগে যুগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জন্ম দিয়েছে অসংখ্য কীর্তিমানের। দেশ-কালের গন্ডি পেরিয়ে  তারা স্মরণীয় হয়ে আছেন ইতিহাসের পাতায়। বিজ্ঞান, সাহিত্য, অর্থনীতি, সমাজনীতিসহ জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় উৎকর্ষ সাধন করেছেন তারা। তাদের জীবন, কর্ম এবং অবদান সম্পর্কে সংক্ষেপে পর্যায়ক্রমে তুলে ধরা হবে ‘কীর্তিমান’ সিরিজে। আজ থাকছে বিজ্ঞানী আব্দুস সাত্তার খানের বর্ণাঢ্য জীবনের কিছু অংশ।

Content - 1 (2)

বর্তমানে আমরা যে পৃথিবীকে দেখতে পারছি, আজ থেকে ১০০ বা তারও আগে আমাদের পৃথিবী এমন ছিল না। অনেক পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা আজকের এই পৃথিবী পেয়েছি। এই পরিবর্তনের পিছনে অবদান আছে অনেক শাখার। তবে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন এসেছে বিজ্ঞানের হাত ধরে। জীবন ও বিজ্ঞান যেন একই সূত্রে গাঁথা। বিজ্ঞানের কল্যাণে আমাদের জীবন হয়েছে সুন্দর, সহজ আর গতিময়।

এই গতিময়তার দিকটি প্রকাশ পায় মহাকাশ গবেষণা ও বিমান আবিস্কারের ক্ষেত্রে। বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিস্কার এই পরিবর্তনশীল পৃথিবীকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। তেমনি আধুনিক যুদ্ধ বিমানের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী নাম এফ-১৬, এটা এখনও এতটাই কার্যকর যে কিছুদিন আগে প্রশান্ত মহাসাগরের উপরে হয়ে যাওয়া ছদ্ম ডগফাইট বা আকাশযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর সর্বাধুনিক ও সবচেয়ে ব্যয়বহুল যুদ্ধবিমান এফ-৩৫ কে নাস্তানুবাদ করেছে!

নাসার বিভিন্ন উড়োজাহাজ ও মহাকাশে নাসার বিভিন্ন স্পেস শাটল দেখে আমরা হয়তো অনেকেই আশ্চর্য হই কিন্তু অনেকেই জানিনা উপরে বলা সেই এফ-১৬ যুদ্ধবিমানকে আরও আধুনিক ও শত্রুর বিপক্ষে আরও কার্যকর করে তুলতে বা নাসার বিভিন্ন উড়োজাহাজকে আরও গতিশীল, দ্রুত উড্ডয়ন ও জ্বালানী সাশ্রয়ী করে তুলতে কাজ করেছিলেন এক বাংলাদেশী বিজ্ঞানী, হ্যাঁ কথা বলছি, বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত মহাকাশ গবেষক আব্দুস সাত্তার খানকে নিয়ে।

১৯৪১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করা আব্দুস সাত্তার খান বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত মহাকাশ গবেষক। ছোটবেলায় চুন্নু নামেই সকলের নিকট পরিচিত ছিলেন তিনি।   কর্মজীবনে তিনি নাসা, ইউনাইটেড টেকনোলজিসের প্র্যাট এন্ড হুইটনি এবং অ্যালস্টমে (সুইজারল্যান্ড) কাজ করেছেন। রতনপুর উচ্চ বিদ্যালয় এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর ভরতি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে, সেখান থেকে ১৯৬২ সালে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৬৩ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। তিনি ১৯৬৪ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট করতে যান এবং ১৯৬৮ সালে রসায়নের উপর ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি দেশে ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। এবং ঐ বছরই ধাতব প্রকৌশল নিয়ে গবেষণা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র গমন করেন।

পরে তিনি ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটির যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কাজ শুরু করেন।  তিনি নাসা  ইউনাইটেড টেকনোলজিস এবং অ্যালস্টমে কাজ করার সময়ে প্রায় ৪০টির বেশি বিভিন্ন ধরনের এ্যালোয় বা সংকর ধাতু আবিষ্কার করেন। এই সংকর ধাতুগুলো ইঞ্জিনকে আরো হালকা করেছে, যার ফলে উড়োজাহাজের পক্ষে আরো দ্রুত উড্ডয়ন সম্ভব হয়েছে এবং ট্রেনকে আরো গতিশীল করেছে। এই এ্যালোয় মূলত খুবই তাপ-উৎপাদন যন্ত্রে ব্যবহৃত হয়, যেমনঃ টারবাইন বা জেট ইঞ্জিনে। এই বিশেষ এ্যালোয়গুলোর কাজ হচ্ছে এইসব স্টিলকে মরিচারোধী করা।

তাঁর তৈরি করা এক ধরনের এ্যালোয় বর্তমানে এফ-১৫ এবং এফ-১৬ বিমানে ব্যবহৃত হচ্ছে

তাঁর তৈরি করা এক ধরনের এ্যালোয় বর্তমানে এফ-১৫ এবং এফ-১৬ বিমানে ব্যবহৃত হচ্ছে

এই এ্যালোয়ের কাজ হচ্ছে বিমানের ইঞ্জিনের ফুয়েলের কারজকারিতা বাড়ানো। শুধু ফাইটার জেটে নয়,  নাসার শাটলে, সুইজারল্যান্ডের রেল ইঞ্জিনে, ইন্ডাস্ট্রিয়াল টারবাইন ইঞ্জিনে ব্যবহৃত হচ্ছে তার উদ্ভাবিত এ্যালোয় সমূহ।

আব্দুস সাত্তারের গবেষণা এবং মহাকাশে তার প্রয়োগের জন্য তিনি নাসা, আমেরিকান বিমানবাহিনী, ইউনাইটেড টেকনোলজি এবং অ্যালস্টম থেকে অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেন। তিনি ব্রিটেনের রয়েল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রির একজন পেশাদার রসায়নবিদ এবং নির্বাচিত ফেলো। তিনি স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৫ সালে যুক্তরাজ্য থেকে পেশাজীবী বিজ্ঞানী হিসেবে রয়েল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রি এবং এর আগে ১৯৯৬ সালে যুক্তরাজ্যের রয়েল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রি থেকে ফেলো নির্বাচিত হন। যুক্তরাষ্ট্রের সোসাইটি অব মেটালসেরও সদস্য তিনি। ১৯৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান এফ-১৫ ও এফ-১৬-এর ইঞ্জিনের জ্বালানি খরচ কমানোয় বিশেষ অবদান রাখার জন্য পান ইউনাইটেড টেকনোলজিস স্পেশাল অ্যাওয়ার্ড। ১৯৯৪ সালে পান উচ্চগতিসম্পন্ন জেট বিমানের ইঞ্জিন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে অবদানের জন্য ‘ইউনাইটেড টেকনোলজিস রিসার্চ সেন্টার অ্যাওয়ার্ড অব এক্সিলেন্স’ পদক।

১৯৯৩ সালে পান ‘প্রাট অ্যান্ড হুইটনি’র বিশেষ অ্যাওয়ার্ড। পেশাদার বিজ্ঞানী থেকে অবসর নেওয়ার পরও তাঁর বিজ্ঞানের সেবা থেমে থাকেনি। এই সময়ে আবদুস সাত্তার ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে যন্ত্র প্রকৌশল বিভাগের গবেষক ও ষাণ্মাসিক অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এখানে কাজ করার সময় কার্বন ন্যানো টেকনোলজি-সম্পর্কিত বস্তুগত বিজ্ঞান ও জৈব রাসায়নিক প্রযুক্তির প্রয়োগের ওপর একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। এ জন্যই তাঁর নাম বিশেষভাবে উচ্চারিত হয় এই বিশ্ববিদ্যালয়ে।

আবদুস সাত্তার খান শুধুমাত্র নিজ কর্মক্ষেত্রেই দীপ্তি ছড়াননি  যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন ধরনের সেবামূলক কাজের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তিনি ফ্লোরিডায় বাংলাদেশি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা এবং এশিয়ানদের স্থানীয় সংগঠক হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের প্রলয়ংকরী বন্যার সময় তিনি রেডক্রসের মাধ্যমে ৬১ হাজার ডলার বাংলাদেশে পাঠান। তিনি টেক্সাসের লামার বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটি যোগসূত্র স্থাপন করে দিয়েছেন, যার কারণে লামার বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ‘সাত্তার ট্রাস্ট’ নামের একটি সংস্থাও খোলা হয়েছে।

জগত জুড়ে পরিচিত এই গুনী বাংলাদেশী ২০০৮ সালের ৩১ জানুয়ারী ৬৭ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা শহরে  মৃত্যু বরণ করেন। বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেলেও দেশে ও তার নিজ জন্মস্থানে খুব বেশি পরিচিত হতে পারেননি তিনি, তাই তার কর্মময় জীবন ও কৃতিত্ব সমূহ যদি আরও বেশি করে সকলের নিকট প্রচার করার যায় তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারবে তার সাফল্য গাঁথা গুলো আর এর মাধ্যমেই তিনি যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকবেন সকলের হৃদয়ের মণিকোঠায়।

এমদাদুল হক রণ

 

Share Button
Print Friendly

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Close
Please support the site
By clicking any of these buttons you help our site to get better