‘She sells seashells by the seashore’ এর পেছনের কথা

‘পাখি পাকা পেঁপে খায়’/’জলে চুন তাজা, তেলে চুল তাজা’ খুব দ্রুত আওড়ানোর মত এমন হতচ্ছারা জিহ্বা-জড়ানো চ্যালেঞ্জের মুখে কতবারই না পড়েছি আমরা।

নাহ সে চ্যালেঞ্জ দিতে যাচ্ছি না মোটেও। আসলে বাংলা ছাড়াও দুনিয়ার তাবৎ ভাষাজুড়ে-ও রয়েছে এমন বহু ‘জিহ্বা-জড়ানো বুলি’, প্রচলিত ইংরেজিতে ‘Tongue Twister’। যেমন, ইংরেজিতে ‘She sells seashells by the seashore’, ‘Peter Piper picked a peck of pickled peppers'; ফরাসি ভাষায় ‘un chasseur sachantchassersaitchasser sans son chien de chasse'; জার্মান ভাষায় ‘Esgrünt so grün, wennSpaniensBlütenblühen’।

unnamed

 

মজার ছলে আওড়ানো এসব বুলির কোনটি যে এতটা গুরুত্ববহ ইতিহাসের সাক্ষী হতে পারে, ধারণা ছিল না মোটেও। বলছি ‘She sells seashells by the seashore’ এর কথা।

 

unnamed (1)

১৯০৮সালেড্রারিলেনেঅনুষ্ঠিত Dick Whittington and His Cat এরপোস্টার

 

 

 

এই দুরুচ্চার্য শব্দগুচ্ছটি আসলে একটি গানের অংশ, যা ১৯০৮ সালে ব্রিটিশ বিচিত্রানুষ্ঠান শিল্পী উইল্কি বার্ড (১৯ মার্চ,১৮৭৪- ৫ মে,১৯৪৪) লন্ডন শহরের ড্রারি লেনে ‘Dick Whittington and His Cat’ শিরোনামের এক অনুষ্ঠানে গেয়েছিলেন। গানটি টেরি সালিভানের লেখা এবং হ্যারি গিফর্ড এর সুর করা। গানটি এরকম-

 

“She sells seashells by the seashore,

unnamed (2)

১৮৪২ সালের ফেব্রুয়ারিতে উইলিয়াম গ্রে-র আঁকা তৈলচিত্রে মেরি অ্যানিং, ছবিতে জীবাশ্মসমৃদ্ধ জুরাসিক মেরিন বেড লক্ষ্যণীয়। মেরি অ্যামোনাইট নামক জীবাশ্মের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করছেন এবং তাঁর চিরন্তন কর্মসঙ্গী কুকুর ট্রেকেও দেখা যাচ্ছে।

The shells she sells are seashells, I’m sure.

So if she sells seashells on the seashore,

Then I’m sure she sells seashore shells.”

 

 

সেখান থেকেই বহুল পরিচিতি পেয়ে প্রথম লাইনটি ইংরেজি ভাষার একটিঅতি বিখ্যাত টাং টুইস্টার হয়ে যায়।

 

তবে উইল্কি বার্ড বা তাঁর এ গানও আমার আজকের লেখার মূল চরিত্র নয়। আমি বলতে চাইছি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন সে নারীর কথা যিনি বিজ্ঞানের ইতিহাসে, আরও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বললে জীবাশ্মবিদ্যার ইতিহাসের Princess of Paleontology আর ভূবিজ্ঞানের দুনিয়ার Geological Lioness, ‘Seashell’-বিক্রেতা সেই ‘She’- মেরি অ্যানিং।
মেরি আনিং (২১ মে,১৭৯৯- ৯ মার্চ, ১৮৪৭) দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডের ইংলিশ চ্যানেল উপকূলীয় ডোরসিট কাউন্টির লাইম রিজিস শহরে জন্মগ্রহণ করেন। কাঠমিস্ত্রী বাবা রিচার্ড অ্যানিং আর মা ম্যারি মুরের ৯ সন্তানের মধ্যে শুধু মেরি আর তাঁর ভাই যোসেফ ছাড়া বাকি সবাই শিশু অবস্থায়ই মারা যায়। পেটের দায়েই মেরি আর জোসেফ সমুদ্রতীরে শামুক-ঝিনুক আর পাথর কুড়িয়ে বিক্রি করতেন।

 

প্রাগৈতিহাসিক জীবন আর পৃথিবীর ইতিহাসসম্পর্কে তাবৎ দুনিয়ার এতদিনের ধারণাকে ঝিনুক কুড়াতে কুড়াতেই পালটে দেন এ নারী। আবিষ্কার করেন বহু প্রাগৈতিহাসিক যুগের প্রাণীদের জীবাশ্ম।

 

unnamed (3)

মেরি অ্যানিং এর শহর লাইম রিজিসে নির্মিত মিউজিয়াম

unnamed (4)

অ্যামোনাইটফসিলের অনুকরণে নকশা করা ‘লাইম রিজিস মিউজিয়ামের’ প্যাভমেন্ট

ডোরসিটের ইংলিশ চ্যানেল উপকূলের ব্লু লায়াস পাহাড়ি অঞ্চলে জীবাশ্ম খুঁজে বেড়াতেন মেরি। ব্লু লায়াস পাহাড়ি অঞ্চল মূলত ভূতাত্ত্বিক দিক থেকে জুরাসিক যুগীয় ভূগঠন। তাছাড়া ২০০ বছর আগে এই অঞ্চল সম্পূর্ণরূপে সমুদ্রের তলদেশে অবস্থিত ছিল। তাই এ পাহাড়গুলোর পাথুরে মাটির নিচে জুরাসিক যুগের বিভিন্ন বিস্ময়কর সামুদ্রিক প্রাণীর ধ্বংসাবশেষ আটকা পড়েছিল। সেসব জীবাশ্ম খুঁজে এনে এই অঞ্চলকে ‘জুরাসিক মেরিন বেড’ এর তকমা এনে দেন এই নারী।

unnamed (6)

Plesiosaurus dolichodeirusএরজীবাশ্মকংকালআবিষ্কারেরপরমেরি আনিং এর আঁকা স্কেচ ও চিঠি, ২৬ ডিসেম্বর ১৮২৩

 

মজার ব্যাপার হল, মূল ধারারপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হবার সুযোগ পাননি এই নারী। দরিদ্রতাও ছিল নিত্য সঙ্গী। তবে কর্মজীবী শিশুদের জন্য রবিবারেরখ্রিস্টান ধর্মসভাইয় লিখতে-পড়তে শিখেছিলেন। সে জ্ঞান ব্যবহার করে নিজে নিজেই চিনতে শিখেন পাথর (ভূতত্ত্ব), শিখে নেন প্রাণীদেহের অন্তর্গঠন (অ্যানাটমি)।জীবাস্মীভূত প্রাণীমল শনাক্তকরণ

 

আসলে শুধু শিখে নেন বললে ভুল হবে। তিনি জীবাশ্মবিদ্যাকে এতটা পারদর্শিতার সাথে হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন যে, যেকোনও প্রাণীকঙ্কাল বা তার অংশবিশেষ পাওয়ামাত্র তিনি প্রাণীটিকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে শ্রেণীবদ্ধ করে ফেলতে জানতেন। তিনি হাড়গুলোকে একটা ফ্রেমে নিয়ে সঠিক জয়েন্টে আবদ্ধ করে মডেল বানিয়ে এরপর এর স্কেচ-ও এঁকে ফেলতেন। তাঁর কাজের দক্ষতা দেখলে মনে হত যেন জীবাশ্মবিদ্যায় প্রচুর জ্ঞানধারী কোন গবেষক এর কাজ সেটা।

 

তাঁর প্রথম খ্যাতনামা আবিষ্কার ছিল ১৮১১ সালে। মাত্র ১২ বছর বয়সেতিনি প্রথম পূর্ণাঙ্গ একটি ইকথিওসর কঙ্কালের জীবাশ্ম আবিষ্কার করেন।ইকথিওসর হল বিরাটাকার সামুদ্রিক সরীসৃপ যা IchthyosauriaবাIchthyopterygiaবর্গের অন্তর্ভুক্ত মেসোজোয়িক যুগের প্রাণী। ধারণা করা হয় ইকথিওসর এবং আধুনিক যুগের ডলফিন, তিমি একই পূর্বপুরুষ হতে আগত।

unnamed (7)

১৮১১ সামে মেরি আনিং কর্তৃক আবিষ্কৃত Ichthyosaurus platyodon এর কঙ্কাল

 
১৮২৩ সালে মেরি প্লেসিওসর কঙ্কাল আবিষ্কার করেন। এর আগে থমাস জেমস বারচ প্লেসিওসরাস আবিষ্কার করলেও মেরি অ্যানিং এর জীবাশ্ম কঙ্কালটি তুলনামূলক বেশি পূর্ণাঙ্গ ছিল। এরপর ১৮২৯ সালের ডিসেম্বরে মেরি Pterodactylusmacronyxএর জীবাশ্ম খুঁজে পান। 

 

তিনি Belemnoidea গোত্রভুক্ত কিছু প্রাণিজীবাশ্ম বা বেলেমনাইটস খুঁজে পান যা মূলত কালি সমৃদ্ধ কিছু চ্যাম্বার ছিল। তিনি চ্যাম্বারগুলোর গঠন পর্যবেক্ষণ করে দেখেন যে, এখনকার সেফালোপডস বা স্কুইড-কাটলফিশদের আত্মরক্ষায় ব্যবহৃত কালি ছোঁড়ার স্যাক একই ধরনের গঠনযুক্ত। এখন আমরা জানি যে,  Belemnoidea হল Cephalopodaশ্রেণির একটি বিলুপ্ত গোত্র মাত্র।

তখনকার রহস্যজনক গঠনের ‘Bezoar Stone’ যেইকথিওসরদের জীবাশ্মীভূত মল ছাড়া আর কিছু নয় সেটাও মেরিই বলেছিলেন। William Buckland ১৮২৯ সালে মেরির এ ধারণাকে বিজ্ঞানজগতে নথিভুক্ত করেন এবং কপ্রোলাইট নাম দেন।

 

DuriaAntiquior (প্রাচীনকালের ডোরসিট)নামের এ বিখ্যাতচিত্রকর্মটি ১৮৩০ সালে ভূতত্ত্ববিদ Sir Henry Thomas De la Becheমেরিঅ্যানিংএরআবিষ্কৃতজীবাশ্মেরওপরনির্ভরকরেআঁকা।প্রাগৈতিহাসিকজীবনেরজীবাশ্মগতপ্রমাণের প্রথম সচিত্র উপস্থাপনা ছিল এই চিত্রকর্মটি।

DuriaAntiquior (প্রাচীনকালের ডোরসিট)নামের এ বিখ্যাতচিত্রকর্মটি ১৮৩০ সালে ভূতত্ত্ববিদ Sir Henry Thomas De la Becheমেরিঅ্যানিংএরআবিষ্কৃতজীবাশ্মেরওপরনির্ভরকরেআঁকা।প্রাগৈতিহাসিকজীবনেরজীবাশ্মগতপ্রমাণের প্রথম সচিত্র উপস্থাপনা ছিল এই চিত্রকর্মটি।

 

তিনি তৎকালীন বহু ভূতাত্ত্বিক ও জীবাশ্মবিদদের সাথে কাজ করেছেন যেমন- উইলিয়াম বাকল্যান্ড, রড্রিক মুরচিসন, থমাস হকিনস, লুইস আগাসিজ, রিচারর্ড ওয়েন, কনিবেয়ার, গিডিওন ম্যান্টেল প্রমুখ অনেকে। কিন্তু কেউই তাঁর কাজের স্বীকৃতি বা তাদের কাজে তাঁর অবদানের কথা উল্লেখ করেননি। এমনকি উইলিয়াম বাকল্যান্ড, রড্রিক মুরচিসন প্রমুখ অনেক বিজ্ঞানী তাঁর আবিষ্কৃত অনেক জীবাশ্ম প্রজাতিকে নিজের নামে নামকরণ করেছেন। একমাত্র লুইস আগাসিজ নামের এক পরিবেশবিদ মেরির জীবদ্দশায় কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ মেরির নামে একটি প্রজাতির নামকরণ করেছিলেন।

 

Jean Louis Agassiz

Jean Louis Agassiz

অল্পবিস্তর পরিচিত পেলেও তাঁর কাজের গরিমার তুলনায় তেমন স্বীকৃতি পাননি জীবদ্দশায়। এভাবেই নারী হিসেবে বিজ্ঞানসমাজে অবহেলিত অবস্থায়ই স্তন ক্যান্সারে মারা যান এ মহিয়সিনী। প্রাগৈতিহাসিকতাকে প্রতিষ্টিত করে, পৃথিবীর ইতিহাস যে কতটা পুরনো তা প্রমাণ করে গেলেও নিজের জীবনে সে প্রতিষ্ঠাসুখ ভোগ করে যেতে পারেননি।

অবহেলা আর বিস্মৃতির ২০০ বছর পর ১৯৯৯ সালে তাঁর ২০০তম জন্মবার্ষিকীতে স্যার ক্রিস্পিন টিকেলের আহবানে লাইম রিজিস শহরে “Mary Anning and Her Times: The Discovery of British Palaeontology,1820–1850” শিরোনামে একটি সম্মেলন হয়। এরপর ২০০৫ সালের ১৭ এপ্রিল ‘দ্য সোসাইটি অব সিগমা গামা এপসাইলন- আর্থ সায়েন্স অনারারি’ তাঁদের ৩৯তম দ্বিবার্ষিক কনভেনশনে মেরিকে স্বীকৃতি দেন।  পরবর্তীতে ২০১০ সালের মার্চে রয়্যাল সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত ‘বিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রভাবশালী ১০ ব্রিটিশ মহিলা’ তালিকায় জায়গা করে নেন মেরি অ্যানিং।

২০১৪ সালের ২১ মে মেরি অ্যানিং এর ২১৫তম জন্মবার্ষিকীতে গুগল স্মারক ডুডল তৈরি করে।

unnamed (9)

 

এভাবেই বিস্মৃতির তলানি থেকে বেরিয়ে আসেন ইতিহাসের প্রথম নারী ভূতাত্ত্বিক। জেনে-না জেনে আওড়ানো ‘Seashell-seller’ মেয়েটি হিসেবে আমাদের মুখে মুখে চিরকাল হয়তো এভাবেই অমর হয়ে থাকবেন তিনি।

‘She sells seashells by the seashore’ দ্রুত বলতে পারবেন তো এবার??

 সানজিদা এনাম সুপ্রা 
লেদার প্রোডাক্টস ইঞ্জিনিয়ারিং
ঢাকা,বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

________________________________________________________________________The End______________________________

Share Button
Print Friendly

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Close
Please support the site
By clicking any of these buttons you help our site to get better