ছারপোকা সমস্যায় ঢাবির হল: বাস্তবতা ও সমাধান

Bed_bug,_Cimex_lectularius

ছারপোকা! এই  ক্ষুদ্র জীবটি রীতিমত এক আতঙ্কের কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাস করা আবাসিক শিক্ষার্থীদের নিকট। হাজার হাজার শিক্ষার্থীর রাতের ঘুম হারাম হচ্ছে সিমিসিডে গোত্রের এই ছোট্ট পরজীবীর নীরব তান্ডবে। নিজেরা খাক বা না খাক ঠিকই এর খাবারের যোগান দিয়ে যাচ্ছে অসহায় শিক্ষার্থীরা।

নীবর হাহাকার আজ প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীর মনে। বিছানা, বালিশ, মশারী, বইয়ের পাতা, আলমারির তলা, শার্ট-প্যান্টের কোনে কোথায় নেই এটি?  যতই এর থেকে মুক্তির উপায় চিন্তা করা হচ্ছে, ঠিক তার দ্বিগুন গতিতেই যেন বংশবিস্তার করে সৈন্য-সামন্ত জোগাড় করার চেষ্টা করছে এটি।

যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীদের একটি বক্তব্য এ উদ্বেগকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে, দিন দিন শক্তিশালী হওয়া এই ছারপোকা নিধনে আগের তুলনায় এখন নাকি আরো এক হাজার গুন বেশি ক্ষমতা সম্পন্ন কীটনাশকের প্রয়োজন! তাই কীটনাশক-রাসয়নিকের পিছনে না দৌড়িয়ে এখন সময় এসেছে কিভাবে এর বংশ সমূলে উত্‍পাট করা যায় তা নিয়ে চিন্তা করার। কারণ, একবার বাসা বেঁধে ফেললে একে স্থানচ্যুত করা বড়ই কষ্টসাধ্য।

শুধুমাত্র একটি মহিলা ছারপোকা তো দুই মাসের মধ্যে পুরো একটি আবাসিক ভবনে বংশবিস্তার করে ছেয়ে ফেলার জন্য যথেষ্ট। আরো দু’টি তথ্য দিয়ে রাখি, রক্তচোষা এরকম ২০০টি ছারপোকা যদি একসাথে ছেড়ে দেওয়া যায়, তাহলে মাত্র দুই মাসের মধ্যে একজন পূর্ণ বয়স্ক ব্যক্তির সম্পূর্ন রক্ত চুষে খেতে সক্ষম। আর একবার রক্ত পান করতে পারলে প্রায় ৬মাস পর্যন্ত না খেয়ে বাঁচতে পারবে এটি। তাই ছারপোকা থেকে নিজেকে যতই বাঁচিয়ে চলার চেষ্টার করুন খুব বেশি লাভ নেই তাতে, এটি কিন্তু ঠিকই বেঁচে থাকবে। এবার আসুন জেনে নেওয়া যাক কি কারনে ঢাবির হল গুলো এই রক্তচোষাদের নজরে থাকে, কেনই বা তাদের এত পছন্দের জায়গা এটি?

bedbugs.com-bed-bugs-on-mattress-corner

এক গবেষণায় দেখা গেছে স্যাঁতসেতে, অস্বাস্থ্যকর, অপরিষ্কার পরিবেশই এই ছারপোকাগুলোর বসবাসের জন্য উপযুক্ত জায়গা। বাস্তব কঠিন হলেও সত্য যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল গুলোর উন্নত পরিবেশের অভাবেই ছারপোকারা বংশ বিস্তার করে নিজেদের উন্নত করার সুযোগ পাচ্ছে। ছেলেদের তুলনায় ছাত্রীদের হল গুলো কিছুটা পরিষ্কার থাকায় সেখানে এর উপদ্রব কম বলে জানা গেছে। তাই এর উপদ্রব থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে প্রথমেই নজর দিতে হবে উন্নত পরিবেশ, নিজের ব্যক্তিগত ও অন্যের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা থাকা বিষয়টির উপর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই কয়েকজন শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে জানা গেল ছারপোকা সম্পর্কে তাদের করুণ বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা। সম্পূর্ন নিশাচর না হলেও রাতে সক্রিয় হওয়া এই ছারপোকার তাড়নায় রাতে ঠিকমত ঘুমাতে পারে না তারা। বিশেষ করে, গরমের সময় এই আক্রমনের মাত্রা যেন নতুন রুপ নেয়। বাধ্যহয়ে অনেকে দিনের বেলায় ঘুমায়, যার কারণে যথাসময়ে ক্লাসও করতে পারে না অনেক শিক্ষার্থী। বিছানা-বালিশ সর্বত্র ছারপোকার দখলে থাকায় বাধ্যহয়ে অনেকে মসজিদ বারান্দার সামনে আশ্রয় নেয় একটু শান্তিতে ঘুমানোর জন্য। নিজেদের এই করুণ অবস্থার পিছনে নিজেরাও যেমন কিছুটা দায়ী তেমনি আশেপাশের স্যাঁতসেতে পরিবেশও। তবে এ থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে নিজেরাই চেষ্টা করছে বাস্তবসম্মত সমাধান খোঁজার। ছারপোকা মুক্ত হল পাবার এরকম কিছু করনীয় কাজ বা সমাধান দেওয়া হচ্ছে এখানে-
আলোকজ্জ্বল পরিবেশ: ছারপোকা তাড়ানোর প্রাথমিক চিকিত্‍সা হলো রুমে লাইট জ্বালিয়ে রাখা অথবা আগুন চিকিত্‍সা।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা: ছারপোকা ময়লা অপরিষ্কার জায়গায় থাকতে পছন্দ করে এবং ঐখানে ডিম পাড়ে, তাই সবচেয়ে ভালো হয় বংশবৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে যেন ডিম না পাড়তে পারে তার ব্যবস্থা করা। এজন্য হলের রুম সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। এবং যেখানে যেখানে ছারপোকা থাকার সম্ভাবনা আছে, সেইসব জায়গায় সপ্তাহে বা মাসে অন্তত একবার গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা। এবং অতিরিক্ত ও অগোছালাভাবে জিনিসপত্র না রাখা।

রোদের ব্যবহার: ছারপোকা সাধারণত ১১৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৩০-৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেই মারা যায়। এজন্য ছারপোকা আক্রান্ত তোষক, বালিশ, মশারী, গদি, লেপ, কম্বল,  কাঁথা খুব কড়া রোদে কমপক্ষে ৬ ঘন্টা শুকাতে হবে, যাতে করে উচ্চতাপে ছারপোকা মারা যায়।

স্প্রে পদ্ধতি: ৬-৭ টা সার্ফ এক্সেল কিনে তা ১/১.৫ লিটার পানিতে গুলিয়ে খাট বা বিছানার প্রতি ইঞ্চিতে স্প্রেয়ার দিয়ে স্প্রে করে দিতে পারলে ছারপোকার ডিম সমূলে নষ্ট হবে এতে ছারপোকার উপদ্রব কমবে। এছাড়া ছারপোকা দমনে ল্যাভেন্ডার ওয়েল এবং এলকোহল ও স্প্রে করা যেতে পারে।

ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের ব্যবহার: রুম ভালো করে ভ্যাকুয়াম করতে হবে। এছাড়া দেয়াল থেকে বিছানাটা একটু দুরে রাখতা পারলে ভালো হয়, এতে করে ছারপোকা দেয়াল বেয়ে বিছানায় যেতে পারবে না। ভ্যাকুয়াম করার পর ছারপোকা চলে গেলেও জিনিসপত্রাদি নিয়মিত রোদে শুকাতে হবে যাতে নতুন ছারপোকা জন্মানোর সম্ভাবনা না থাকে।

bed-bug-photos-clipart-images-3

কীটনাশক প্রয়োগদীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি হিসেবে কীটনাশক যেমন- রিলোক্সিন, সিপরাপ্লাস, মেগাবন ইত্যাদি বিছানাপত্রের উপর প্রয়োগ করা যেতে পারে। এগুলো প্রয়োগের সময় অবশ্যই সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত ।

কিজুর তেল ব্যবহার:  সামান্য গন্ধযুক্ত তেলটা খূবই বিষাক্ত। কাঠের আসবাবপত্র ও খাটের কোনায় একবার মাখিয়ে নিতে পারলে ছারপোকাতো দুরের কথা, এই তেলের ক্রিয়াতে কাঠ পর্যন্ত ঘুনে ধরবে না। কিন্তু ব্যবহারের সময় খুব সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ২০০-২৫০ টাকার মধ্যে আশেপাশের হার্ডওয়্যারের দোকানেই পাওয়া যাবে এই তেল ।

৮। কেরোসিনের ব্যবহার:  কেরোসিন হলো ছারপোকার যম। স্প্রের বোতলে ২৫০মিলি কেরোসিন ভরে রুমের দেওয়ালের গোড়ায় গোড়ায় স্প্রে করতে পারলে, ছারপোকার বংশ নির্বংশ হবে।

ঝাউ গাছের ব্যবহার: বিছানার নিচে বা রুমের সামনে ঝাউ গাছের ডাল বেঁধে রাখতে পারলে তাতেও নাকি ছারপোকা দুর হয় ।

১০ট্যালকম পাউডারের ব্যবহার: ছারপোকা আক্রান্ত ব্যবহার্যের জিনিসপত্রে ট্যালকম পাউডার ছিটিয়ে দিলে ছারপোকা শ্বাসরোধ হয়ে মারা যায় ।

১১ফাঁটল বন্ধ করা: তাছাড়া দেয়াল বা খাটের যেকোন ফাঁটল প্লাস্টিক টেপ দিয়ে বন্ধ করে দিতে পারলে এবং বিছানায় প্লাস্টিক সিট বিছিয়ে দিতে পারলে ছারপোকার কামড় থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।

কিন্তু এতঃসত্ত্বেও আনন্দের সংবাদ হলো, শিক্ষার্থীদের এই করুণ অবস্থা টনক নড়িয়েছে প্রশাসনের। তারা নতুন নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সেই সাথে হল পরিবেশকে উন্নত করার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। যার ফলশ্রুতিতে, জিয়া হল প্রতিবছর ছারপোকা নিধন কর্মসূচি পালন করে আসছে। ঢাবির অন্যান্য হল গুলোতেও ছারপোকা দমনে আরো ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ করা হবে এ ব্যাপারে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে।  সর্বোপরি, নিজেদের বসবাসের রুম পোশাক-পরিচ্ছেদ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং ব্যক্তিগত সচেতনতাই পারবে ছারপোকা মুক্ত হল উপহার দিতে, এবং তখনই হলের প্রতিটি শিক্ষার্থীর অন্তত এক বেলা শান্তির ঘুমের ব্যাপারটি নিশ্চিত হবে।

এমদাদুল হক রণ

Share Button
Print Friendly

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Close
Please support the site
By clicking any of these buttons you help our site to get better