মমন্থ মাসহাক মন্ময় – ঢাবি থেকে গুগলের আঙ্গিনায়

জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন ও প্রযুক্তি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান গুগল, সারা বিশ্বের সব থেকে সেরা প্রোগ্রামার ও সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারদের এক স্বপ্নের জায়গা। সেখানকার একেকজন ইঞ্জিনিয়ার যেন একেকজন তারকা। পারিশ্রমিকেই হৌক আর সম্মান কিংবা সুযোগ সুবিধাতেই হৌক গুগল তাঁর কর্মীদের যোগ্য মর্যাদা দিতে একটুও কার্পণ্য করে না।

এমন স্বপ্নের স্থানে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৪০-৫০ জনের মত প্রোগ্রামার কিংবা সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার আছেন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই সংখ্যা ৫।ঢাবি থেকে সর্বশেষবারের মত যিনি গুগলে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি হলেন সিএসই বিভাগের ১৬তম ব্যাচের মমন্থ মাসহাক মন্ময়। ২০১৪ সালে তৎকালীন সময়ে দেশের সবথেকে কম বয়সী হিসেবে গুগলে যোগদান করেন। বর্তমানে গুগলে সফটওয়ার এবং সাইট রিল্যায়বিলিটি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত আছেন। ডিইউটাইমজের সাথে কথাকোপনে উঠে আসে তাঁর জীবনের নানা দিক, শুরু থেকে আজপর্যন্ত তাঁর এই যাত্রা । আজ আমরা তাঁর সম্পর্কেজানবো।

মমন্থের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়, পড়াশুনা করেছেন মতিঝিল সরকারী বালক উচ্চ বিদ্যালয় এবং সরকারী বিজ্ঞান কলেজে। বাবা সরকারী চাকরিজীবী ছিলেন।  তিন ভাই বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট তিনি। বড় ভাই এবং বোন বর্তমানে ব্যাংক কর্মকর্তা।

ছোটবেলা থেকেই ম্যাথে তাঁর প্রচুর আগ্রহ ছিল, জাফর ইকবাল স্যারের গনিত সম্পর্কিত বইগুলো তাঁকে এই ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলে। ফিজিক্সের প্রতিও অনেক আগ্রহী ছিলেন একসময় চেয়েছিলেন ফিজিক্স নিয়ে গবেষক হবেন। কলেজে উঠে প্রথম কম্পিউটার হাতে পান, যা তাঁকে কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করে। যদিও যাত্রাটা মোটেও সহজ ছিলো না, এসএসসি ইংরেজী ও সামাজিক বিজ্ঞানে এ প্লাস পাননি, ম্যাথের প্রতি এতটাই আগ্রহ ছিল যে সামাজিক বিজ্ঞান পরীক্ষার আগের রাতেও তিনি ম্যাথ করছিলেন। এরপর এইচএসইসিতেও দুর্ভাগ্য তাঁর পিছু ছাড়েনি।ম্যাথে অনেক ভালো করা সত্ত্বেও জিপিএ ৪.৬ পান। রেজাল্টখারাপহওয়ারবেশহতাশহয়েপড়েনতিনি। এঁর জন্য বুয়েটে পরীক্ষা দিতেও পারেন নি। যদিও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, সিএসইতে পড়ার স্বপ্নে বুঁদ ছিলেন। ঢাকা সব অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় বেশ প্রথমদিকেই স্থান করে নেন।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় দুটোতেই কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং সাব্জেক্ট পেয়ে যান।

10683601_835185116522275_7326282377148837949_o

মমন্থ মাসহাক মন্ময় 

 

২০১০ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু হয়। সিএসই বিভাগের আশীষ স্যারের ক্লাসে তাঁর প্রথম প্রোগ্রামিংয়ের হাতেখড়ি। প্রথম দিন কিছুই বুঝতে পারছিলেন না, কিন্তু তাঁর শেখার ব্যাপারে প্রবল ইচ্ছা ছিল। মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই তিনি সি প্রোগ্রামিংয়ের বেসিক শেষ করে ফেলেন, যেটি ছয় মাসের কোর্স ছিল! আশীষ স্যারের দিকনির্দেশনাতেই প্রোগ্রামিংয়ের অদ্ভুত জগতে প্রবেশ করেন। সিএসই ডিপার্টমেন্টের অনলাইন জাজের সাথে পরিচিত হন। ফার্স্ট সেমিস্টারে তাঁর বাসায় ইন্টারনেট সংযোগ তখনো ছিলো না। তাই ডিপার্ট্মেন্টের কম্পিউটার থেকে প্রোগ্রামিং সমস্যা ডাউনলোড করে সল্ভ করতেন।

শিক্ষক ও সিনিয়র ভাইয়া আপুদের উৎসাহ ও দিকনির্দেশনায় বিভিন্ন প্রতিযোগীতামূলক প্রোগ্রামিং কন্টেস্টে অংশ নেওয়া শুরু করেন।তাদের কাছেই প্রথম শোনেন ACM ICPC’র কথা।ACM আন্তর্জাতিক কলেজিয়েট প্রোগ্রামিং কন্টেস্ট (ACM ICPC) হচ্ছে অ্যাসোসিয়েশন ফর কম্পিউটার মেশিনারিজ (ACM) এর আয়োজিত একটি বার্ষিক আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা।

অনলাইনেও বিভিন্ন প্রোগ্রামিং কন্টেস্টেও অংশ নেওয়া শুরু করেন।

জাতীয় পর্যায়ে তাঁর প্রথম প্রোগ্রামিং প্রতিযোগীতা ছিল এনসিপিসি-২০১১ যা ঢাবির সিএসই ডিপার্টমেন্ট আয়োজন করে। তাঁর দল এই প্রতিযোগীতায় অংশ নেয় নিজ ডিপার্টমেন্টের মধ্যে সেরা পাঁচটি দলের মধ্যে থেকে। যদিও তাঁর দল খুব বেশি ভালো করতে পারে নি সেবার।

ডিপার্টমেন্টে তাঁর ইচ্ছা ছিল শিক্ষক হবার কিংবা গবেষণা করার। রেজাল্টও ভালোই ছিল। কিন্তু প্রোগ্রামিংয়ের নেশা এমন ভাবেই পেয়ে বসে তাঁকে যে পরে পড়াশুনায় ততটা গুরত্ব দেওয়া হয়নি যতটা প্রোগ্রামিংয়ের পিছনে দিয়েছেন। ফাইনাল পরীক্ষার আগের রাতে পড়তেন, এমনকি পরীক্ষা দিতে যাবার পথে বাসে বসেও পড়াশুনা করেছেন!

পরবর্তীতে জাতীয় পর্যায়ে অনেক প্রতিযোগীতায় অংশ নেন, চ্যাম্পিয়ন হন। প্রথমবারের মত তাঁর দল বিজিসি ট্রাস্ট কন্টেস্টে আটটি সমস্যা সমাধান করে প্রথম হন। আইইউটির আইটি ফেস্টে প্রথম হন, ২০১৩ সালে ইন্টার ইউনিভার্সিটি প্রোগ্রামিং কন্টেস্টে রানার আপ হন।

সফলতার পাশাপাশি কিছু ব্যার্থতার কথাও তিনি জানান। আইপিসিসি অমৃতাপূরী রিজিওনাল কন্টেস্টে তাঁর টীম সহজ কিছু ভুলের জন্য ওয়ার্ল্ড ফাইনালে যেতে পারেন নি কিছু অনলাইন জাজের ব্যাপারে কিছু ভুল বোঝাবুঝির জন্য।

এরপর আসে গুগলে কাজ করার সুযোগ। গুগল ২০১২ সালে বাংলাদেশে ক্যাম্পাস রিক্রুটমেন্ট শুরু করে, যারা সদ্য পাস করে বের হয়েছে তাদের জন্য। সেবার বুয়েট, ঢাবি ও এনএসইউতে পরীক্ষা নেয়। বুয়েট,ঢাবি ও এনএসইউ থেকে বেশ কয়েকজন সেবার গুগলে কাজ করার সুযোগ পায়।

তিনি সুযোগ পান এরপরের বছরের অক্টোবরে। ঢাবি থেকে তিনি সহ আরো দুইজন সেবার ঢাবি থেকেমনোনীতহন। এরপর সাক্ষাৎকার দেবার পালা। তাদেরকে ভারতের ব্যাংগালুরুতে যেতে হয়, সেখানে চারটি সাক্ষাৎকার দিতে হয়েছিলো। এরপরেও সামনে আরো কয়েকটি সাক্ষাৎকার দিতে হয় তাঁকে। তাঁর সাথের দুইজনকে অবশ্য হতাশ হতে হয়। গুগলের নিয়োগ পদ্ধতি বেশ দীর্ঘসূত্রী। অবশেষে তাঁর নিয়োগকর্তা তাঁকে জানান যে তিনি সিলেক্টেড হয়েছেন।কাজ করার জন্য গুগল অস্ট্রেলিয়া, ব্যাংগালুরু ও পোল্যান্ডের মধ্যে একটি স্থানে বেছে নেবার কথা বলা হয়। অবশ্য তিনি শুরু থেকেই চেয়েছিলেন যাতে জুরিখেই কাজ করার ইচ্ছা ছিল। অবশেষে সেই সুযোগ আসে, এপ্রিলের শেষের দিকে তিনি চূড়ান্তভাবে মনোনীত হন গুগলের জুরিখের হেডকোয়ার্টারে। ২০১৪ সালের ১ সেপ্টেমবর তিনি জুরিখের কার্যালয়ে যোগদান করেন।

গুগলে কাজ করার সুযোগ কিভাবে পেলেন তিনি? মমন্থ জানান ,প্রচুর প্র্যাকটিস, এলগরিদম, ডিজাইন, কোডিং সমস্যার সমাধান আর চার বছরে অনেকগুলো প্রোগ্রামিং কন্টেস্টে অংশগ্রহন করার কারনেই এটি সম্ভব হয়েছে। চারপাশের পরিবেশ তাঁকে অনেক সাহায্য করেছে বলে জানান। ঢাবির সিএসই ডিপার্টমেন্টের কথা বিশেষভাবে বলেন। সেখানে প্রচুর প্রোগ্রামিং কন্টেস্ট হত, অনেকবার রাতে ল্যাবেও থেকেছেন তিনি। ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র ভাইয়া আপুরা অনেক সাহায্য করেছেন তাঁকে। চারপাশের প্রচুর মেধাবী মুখ তাঁকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।

গুগলে তাঁর কর্মসাধনা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে তিনি দারুণ আশাবাদী। সেখান থেকে প্রতিনিয়ত তিনি শিখছেন, চারপাশে অনেক বড় বড় প্রোগ্রামারদের সাথে তাঁর কাজ করার অভিজ্ঞতা হচ্ছে। বর্তমানে গুগলের জুরিখ হেডকোয়ার্টারে  তিনি সহ চারজন বাংলাদেশীও আছেন। তিনি সেখানে যোগদানের পর আরো একজন বাংলাদেশী এসেছেন।এর বাইরে, মমন্থ জানান তাঁর প্রিয় কাজ ঘোরাঘুরি। বয়স ২৫ হবার আগেই ১১টি দেশ ঘুরেছেন। বই পড়তে বেশ ভালোবাসেন। তাঁর ছোটবেলার হিরো ছিলেন জাফর ইকবাল। সত্যজিৎ রায়, হ্যারি পটার সিরিজ তাঁর খুবই প্রিয়।

নতুনদের জন্য যারা গুগলে কাজ করতে ইচ্ছুক তাদের জন্য কি উপদেশ, জানতে চাইলে মমন্থ বলেন  সিএসইতে ভর্তি হলে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হল এলগরিদম ও ডেটা স্ট্রাকচার, অবশ্যই ভালো প্রোগ্রামিং জানতে হবে এবং সি প্রোগ্রামিং হচ্ছে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরো বলেন কারো যদি ইচ্ছা থাকে সে ভালো প্রোগ্রামার হবে তবে এটি মোটেও কঠিন কিছু নয়। ইচ্ছাশক্তি, শেখার আগ্রহ, একটি কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই যথেষ্ট। গুগল দুইভাবে কর্মী বাছাই করে থাকে, প্রথমত রেফারেন্সের মাধ্যমে ,গুগলে কাজ করে এমন কারো রেফারেন্স নিয়ে বিভিন্ন সাক্ষাৎকার কিংবা পরীক্ষার মাধ্যমে এখানে কাজের সুযোগ পাওয়া যায়। আর দ্বিতীয়ত ক্যাম্পাস রিক্রুটমেন্ট বা বিভিন্ন কোডিং গেমস কন্টেস্টের মাধ্যমে। গুগল সবসময় সেরা প্রোগ্রামারদের খুঁজে। যারা ভালো প্রোগ্রামার তাদের জন্য এখানে কাজ পাওয়াটা খুব কঠিন কিছু না।

মমন্থ বলেন তিনি নিজের আগ্রহেই প্রোগ্রামিং শুরু করেন, গুগলে কাজ করবেন এমন চিন্তা শুরুর দিকে মাথায় ছিলো না। তিনি কি তাঁর লক্ষ্যে পৌঁছেছেন? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন না! কখনোই পৌঁছাবেন না, কারন লক্ষ্য বলে আসলে কিছুই নেই!! শুরু থেকেই তিনি তাঁর এই যাত্রাকে উপভোগ করছেন, তাঁর কাছে এখানেই জীবনের প্রকৃত আনন্দ নীহিত।

বাংলাদেশকে অনেক মিস করেন তিনি,তাঁর পরিবারকে, মা’কে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস লাইফকেও বেশ মিস করেন, বিশেষকরে তাঁর ব্যাচমেটদের, সিনিয়র ভাইয়া আপু, সবার সাথে আড্ডা, টিএসসি-হাকিম চত্তর-কার্জনে কাটানো সময়গুলোকে।

                                                                                                       

সাক্ষাতকার গ্রহণ ঃ মোঃখায়রুল বাশার,আদনান রহমান অর্নব
লেখাঃসালেহীন কবির রিফাত

 

Share Button
Print Friendly

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Close
Please support the site
By clicking any of these buttons you help our site to get better