সাকরাইনঃ পুরান ঢাকার ঘুড়ি উৎসব

অলিগলির পুরান ঢাকার অন্যতম ঐতিহ্য হচ্ছে ঘুড়ি উৎসব। স্থানীয়রা যেটাকে সাকরাইন ও বলে থাকেন। রঙবেরঙের নানা ঘুড়ি উড়ানো আর দিনভর নানা আয়োজনে প্রতিবছর পৌষ সংক্রান্তির দিন আয়োজিত হয় এটি। এবারে এই উৎসবকে ঘিরেই আমাদের আয়োজন।

12570898_588111054681342_204851921_n

পৌষ সংক্রান্তি হল পৌষ মাসের শেষ দিন। এটি মকর সংক্রান্তি নামেও পরিচিত। মূলত এই দিনটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি ধর্মীয় উৎসব হলেও এখন এটি পরিচিত ঘুড়ি উৎসব হিসেবে। ঠিক প্রথম কবে এই উৎসব চালু হয় তা সঠিকভাবে না জানা গেলেও ধারণা করা হয় মুগল আমলে ঢাকার অভিজাত লোকজনের বিবিধ বিনোদনের মধ্যে ঘুড়ি উড়ানো ছিল অন্যতম। কোনো কোনো সূত্রমতে ১৭৪০-এর দশকে নায়েব-ই-নাজিম  নওয়াজিশ মুহম্মদ খান-এর আমলে ঘুড়ি উড়ানো  উৎসব একটা ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছিল। তখন থেকেই বাণিজ্যিক আকারে ঘুড়ি তৈরি শুরু হয় এবং বাড়ির ছাদ, খোলা জায়গা বা উন্মুক্ত ময়দান থেকে আকাশে প্রচুর সংখ্যক ঘুড়ি উড়তে দেখা যায়। বর্তমানকালেও ঢাকায় ঘুড়ি তৈরি ও বিক্রয়ের দোকান দেখা যায়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রামের লোকজন ধর্মীয় উৎসবের সময় ঘুড়ি উড়ানো প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীরা একবার ঘুড়ির ডোর সংকুচিত করে আবার ছেড়ে দেয় আর এভাবে তারা ঘুড়ি উড়ানো খেলা দেখায় এবং কৌশলে বাতাসে ঘুড়ি চালনা করে। সহজতর প্রতিযোগিতার বিষয় হচ্ছে কত উপরে ঘুড়ি উঠানো যায় কিংবা ঘুড়ির অলঙ্করণ কত চমৎকার করা যেতে পারে। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রতিযোগিতা হচ্ছে সুতা কাটাকাটি এবং এতে শেষ পর্যন্ত যে টিকে থাকে সে হয় চ্যাম্পিয়ন। ঐতিহাসিক বিবরণ ও রেকর্ড থেকে জানা যায় যে, ১৮ এবং ১৯ শতকে ঢাকার অভিজাত লোকেরা ঘুড়ি উড়ানোর প্রতিযোগিতার টিমকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করতেন।

সাকরাইন উপলক্ষে পুরান ঢাকার মানুষদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা যায়। এক সময় ঘুড়ি হতে শুরু করে সুতা বানানো সবই হাতে করা হত। যুগের পরিবর্তনে এখন দোকানে মেশিনে তৈরি করা ঘুড়ি, সুতা, নাটাই পাওয়া যাবার জন্যে এই ঐতিহ্য কিছুটা বিলুপ্ত। তবে এখনও অনেকেই সুতা নিজেরাই তৈরি করে নেন।

12576070_588111038014677_74305046_n

সাধারণ সুতা এবং ঘুড়ির সুতার মধ্যে একটি বিশাল প্রভেদ আছে। ঘুড়ির সুতা অনেক মোটা এবং ধারালো হয় যাতে ঘুড়ি উড়িয়ে অন্য ঘুড়ির সাথে কাটাকুটি খেলতে উবিধা হয়। যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাধারণ সুতাকে ঘুড়ির উপযোগী সুতাতে পরিণত করা হয় তাকে বলা হয় মাঞ্জা। এই প্রক্রিয়ায় ভাতের মাড়, কাঁচের সুক্ষ গুঁড়া এবং পছন্দসই রঙ সাধারণ সুতার সাথে মেশানো হয়। এরপর শুকিয়ে নিলেই হয়ে গেল ঘুড়ির সুতা।

12571165_588111004681347_1750492865_n

সাকরাইনে পুরান ঢাকার একএকটা বাড়ি একএক দলের ঘাঁটিতে পরিণত হয়। প্রতিযোগিতা চলে এক বাড়ির সাথে অন্যান্য সব বাড়ির। ঘুড়ি উড়িয়ে অন্য উড়ন্ত ঘুড়ির সুতা কাটাটাই হল প্রতিযোগিতা। আর সুতা কাটা ঘুড়ি হল বিজয়ী দলের পুরস্কার। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে এই প্রতিযোগিতা। নিজেদের উৎসাহ উদ্দীপনা দেয়ার জন্য ছাদে ছাদে চলে গান বাজনা। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় এই উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক পটকা ফুটানো। ছোট-বড় নানা রকম পটকা বাজি, আতশবাজি, তারাবাত্তি আর ফানুস উড়ানোর মধ্য দিয়ে যার সমাপ্তি। তবে এই আলোকক্রিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হচ্ছে আগুন নিয়ে খেলা দেখানো। স্থানীয়রা যেটাকে নিজেদের শৌর্যের প্রদর্শনী বলে মনে করে।

12540128_588111098014671_1295774799_n

আজকাল সাকরাইন পুরান ঢাকার ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পরিণত হয়েছে।

মাহিন বারি 

Share Button
Print Friendly

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Close
Please support the site
By clicking any of these buttons you help our site to get better