বাতাসে সুতোর জাদু

সে একটা সময় ছিল বটে এদেশের পূর্ব বাংলার সোনারগাঁও অঞ্চলে! আজ থেকে প্রায় দুশ বছর আগে যেই রূপকথার ইতি ঘটে। বলছি এককালে এদেশেরবস্ত্রশিল্পের সোনালী দিনের কথা। আর সেই স্বর্ণালি শিল্পকে আরও বর্ণময় করে তুলেছিল সূতিবস্ত্র জগতের পরম বিস্ময় মসলিন কাপড়। আর এই মসলিনকে নিয়েই এবারের আয়োজন।

বাংলা মসলিন শব্দটি আরবি, ফার্সি কিংবা সংস্কৃতমূল শব্দ নয়। এস. সি. বার্নেল ও হেনরি ইউল নামের দুজন ইংরেজ কর্তৃক প্রকাশিত অভিধান “হবসন জবসন”-এ উল্লেখ করা হয়েছে মসলিন শব্দটি এসেছে ‘মসূল’ থেকে। ইরাকের এক বিখ্যাত ব্যবসাকেন্দ্র হলো মসূল। এই মসূলেও অতি সূক্ষ্ম কাপড় প্রস্তুত হতো। এই ‘মসূল’ এবং ‘সূক্ষ্ম কাপড়’ -এ দুয়ের যোগসূত্র মিলিয়ে ইংরেজরা অতিসূক্ষ্ম কাপড়ের নাম দেয় ‘মসলিন’।সম্ভবত ইউরোপীয়রা মসুল থেকে যেসব বস্ত্র আমদানি করত এবং প্রাচ্যের অপরাপর দেশ থেকে মসুল হয়ে যেসব বস্ত্র আনা হতো তারা তার নাম দেন মসলিন। ঢাকার সূক্ষ্মবস্ত্র দেখে তারা সে বস্ত্রেরও নাম করেন মসলিন। কেবল ঢাকার সূক্ষ্মবস্ত্রকেই মসলিন বলা  হতো না, গুজরাট, গোলকুন্ডা ও ভারতের অন্যান্য স্থান থেকে ইউরোপীয়দের আমদানিকৃত যে কোন সূতিবস্ত্রকেই মসলিন নামে অভিহিত করা হতো।অবশ্য বাংলার ইতিহাসে ‘মসলিন’ বলতে বোঝানো হয় তৎকালীন ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে উৎপাদিত অতি সূক্ষ্ম একপ্রকার কাপড়কে।

মসলিন যদিও সূক্ষ্ম কাপড় ছিল তবুও সব সূক্ষ কাপড়কেই মসলিন বলা হয় না। সাধারণত কাপড়ের সূক্ষ্মতাকে প্রকাশ করা হয় কাউন্ট অব থ্রেড একক দিয়ে। আমরা যেসব কাপড় সচরাচর ব্যবহার করি সেগুলোর কাউন্ত নম্বর হয় ৫০, ৮০, ১০০, ১২০, ১৪০, ১৬০ থেকে শুরু করে ২০০ পর্যন্ত। কাউন্ট নম্বর যত বেশি হয় কাপড়ের সূক্ষতাও তত বাড়ে। আর এর সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে কাপড়ের মূল্য। যেখানে সাধারণ কাপড়ের কাউন্ট নম্বর সাধারণত ২০০র কম হয় সেখানে মসলিনের কাউন্ট নম্বর শুরুই হয় ২৫০  থেকে। সবচেয়ে সূক্ষ মসলিন ১৮০০ কাউন্ট পর্যন্ত হয়ে থাকে।

সূক্ষ কাপড় সেটাতো বোঝা গেল কিন্তু কতটুকু সূক্ষ্ম? ‘সিলসিলাতি তাওয়ারিখের’ ইতিহাসবিদ সোলায়মান উল্লেখ করেছেন বাংলার একপ্রকার সূক্ষ্ম সুতিবস্ত্র সেখানকার মুসলিম তাঁতিরা বয়ন করেন যা একটি আংটির ভেতর দিয়ে অনায়াসে বহন করা যায়।৫০ মিটার দীর্ঘ মসলিনের কাপড়কে একটি দিয়াশলাই বাক্সে ভরে রাখা যেতো।১৭৫ গজ বা ৩৫০ হাত মসলিন এক সঙ্গে করলে কবুতরের একটি ডিমের আকারের সমান হতো।এসব মসলিন এত সূক্ষ্ম এবং ওজনে এত পাতলা ছিল যে, অধিকাংশ মসলিনের ওজনই ৭ তোলা থেকে ২০ তোলার অধিক হতো না। মসলিনের সূক্ষতা বিষয়ে অনেক রসালো চকমপ্রদ উপাখ্যানপ্রচলিত আছে। কবার ‘অাঁবে-ই-রওয়া’ নামে মসলিনের এক খণ্ড কাপড়নবাব আলিবর্দী খাঁর প্রাসাদের সম্মুখস্থ জমিনের ঘাসের ওপর শুকাতে দেওয়া হয়েছিল। কোনো এক কৃষকের গাভী মসলিনকে ঘাস মনে করে পুরো মসলিন খণ্ডটিই উদরস্থ করেছিল। নবাব আলিবর্দী খাঁ ওই গাভীর মালিকের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে তাকে শহর থেকেই বের করে দিয়েছিলেন।

মসলিন শিল্প অনেক প্রাচীন হলেও এর প্রসিদ্ধি ঘটে মোগল আমলে। মূলত মোগল শাসনকর্তা আর অন্যান্য ধনিক গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতালাভ এর কারণ। বৃহত্তর ঢাকা জেলার প্রায় সব গ্রামেই তাঁতশিল্প বিদ্যমান ছিল। তবে কয়েকটি স্থান ছিল উৎকৃষ্ট মানের মসলিন তৈরির জন্য প্রসিদ্ধ। এগুলি হচ্ছে: ঢাকা জেলার ঢাকা ও ধামরাই, গাজীপুর জেলার তিতাবদি, নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও এবং কিশোরগঞ্জ জেলার জঙ্গলবাড়ি ও বাজিতপুর।এসব জায়গায় উৎকৃষ্ট মানের মসলিন বস্ত্র তৈরি হতো, কারণ এসব স্থান ছিল মসলিন তৈরির উপযোগী তুলা উৎপাদনকারী স্থানের কাছাকাছি অবস্থিত।

মসলিন কাপড় যেমন সূক্ষ্ম এর বয়ন পদ্ধতিও ছিল সেরকম জটিল। ১ ইঞ্চির ১৫০০ ভাগের ১ ভাগ মাপের সূক্ষ্ম সুতার মসলিন বুনতে স্থানীয়ভাবে তৈরি ১২৬টি বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম ব্যবহার করা হতো। রমণীমোহন একটি শাড়ির জন্য প্রায় ৩০ গ্রাম সুতা তৈরি করতে তাঁতিদের সময় লাগত ২ মাস। ২ হাত প্রস্থ ৪০ হাত দৈর্ঘ্য একটি মসলিন বস্ত্র বুনতে তাঁত শিল্পীদের সময় লাগত ১ থেকে ৩ মাস।ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী কোন কোন এলাকায় ফুটি নামে এক প্রকার তুলা জন্মাত। এর সুতা থেকে তৈরি হতো সবচেয়ে সূক্ষ্ম মসলিন বস্ত্র। অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের আরও দুই ধরনের তুলা ছিল বয়রাতি ও দেশী এবং এগুলি উৎপন্ন হতো ঢাকার বিভিন্ন অংশে ও আশপাশের এলাকায়। এসব তুলা দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম সূক্ষ্ম ও মোটা কাপড় তৈরি হতো। তুলা ধুনা, সুতা কাটার প্রক্রিয়া ও বস্ত্র বয়নের সঙ্গে জড়িত সবাই ছিল তাঁতি পরিবারের। ছোট পরিবার হলে দুতিনটি পরিবার এক সঙ্গে মিলে কাপড় বুননের কাজ করত।সবচেয়ে সূক্ষ্ম মসলিনের নাম ছিল মলমল। বিদেশী পর্যটকরা এই মসলিনকে কখনও কখনও মলমল শাহী বা মলমল খাস নামে উল্লেখ করেছেন। এগুলি বেশ দামি এবং এরকম এক প্রস্থ বস্ত্র তৈরি করতে তাঁতিদের দীর্ঘদিন, এমনকি ছয় মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেত।মুঘল আমলে মসলিন বস্ত্রে সোনালি ও রুপালি সুতায় তৈরি জমিনে মনি-মুক্তা আর মূল্যবান পাথর বসিয়ে নকশা করা হতো।

10557175_262188197308214_3921014116215812712_n

কেমন ছিল মসলিনের দাম? ১৭৪৭ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা থেকে যে পরিমাণ সূতিবস্ত্র (প্রধানত সূক্ষ্ম মসলিন বস্ত্র) রপ্তানি এবং সম্রাট ও নওয়াবদের জন্য সংগৃহীত হয়, তার মূল্য ছিল আটাশ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা।সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে ২ হাত প্রস্থ ও ৩০ হাত দৈর্ঘ্য একখণ্ড মসলিন বস্ত্রের মূল্য ছিল তখনকার ব্রিটিশ মুদ্রায় ৩০ পাউন্ড। সম্রাট আওরঙ্গজেবকে একখণ্ড মলমল খাস মসলিন পাঠানো হয়েছিল, যার ওজন ছিল ৭ তোলা এবং ওই সময়ই ওই মসলিনটির মূল্য ছিল ৪০০ টাকা। সুবাদার ইসলাম খান দিলি্লর সম্রাট জাহাঙ্গীর এবং সম্রাজ্ঞী নূরজাহানকে সোগারগাঁওয়ের খাসনগরের তৈরি ২০ হাজার টাকার ‘মলমল খাস’ মসলিন পাঠিয়েছিলেন।

এত বিখ্যাত মসলিন কালের গর্ভে আজ হারিয়ে গেছে। পলাশীর যুদ্ধ এর পর ঢাকার মসলিন শিল্পে বিপর্যয় নেমে আসে এবং আঠারো শতকের শেষ দিকে ঢাকাই মসলিনের রপ্তানির পরিমাণ ১৭৪৭ খ্রিস্টাব্দের তুলনায় অর্ধেকে নেমে আসে। ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকার মসলিন উৎপাদন হ্রাস পেয়ে দশ লক্ষ রুপিতে এসে দাঁড়ায়।মুগল বাদশা, নওয়াব ও পদস্থ কর্মকর্তাদের পৃষ্ঠপোষকতার অভাবই ঢাকাই মসলিন শিল্পের অবনতির কারণ। মুগলরা কেবল শাসন ক্ষমতা ও মর্যাদাই হারায়নি, একই সঙ্গে তাদের ক্রয় ও ব্যয় করার ক্ষমতাও লুপ্ত হয়। পলাশীর যুদ্ধের পর (১৭৫৭) বাংলার ব্যবসাক্ষেত্রে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এর একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তারের ফলে ইউরোপের অন্যান্য কোম্পানি এবং বিভিন্ন দেশের বণিকদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। তবে মসলিন শিল্পের অবনতি ও চূড়ান্ত বিলুপ্তির সর্বপ্রধান কারণ ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লব এবং আধুনিক বাষ্পশক্তি ও যন্ত্রপাতির আবিষ্কার। এভাবে ইংল্যান্ডের শিল্প-কারখানায় উৎপাদিত সস্তা দামের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হেরে যায় ঢাকার মসলিনের মতো দামি সূতিবস্ত্র। এগুলো ছাড়াও ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে ঊনবিংশ শতাব্দীতে স্থানীযভাবে প্রস্তুত করা বস্ত্রের উপরে ৭০ হতে ৮০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়, যেখানে ব্রিটেনে প্রস্তুত করা আমদানীকৃত কাপড়ের উপরে মাত্র ২ থেকে ৪ শতাংশ কর ছিলো। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের তাঁতশিল্পে ধ্বস নামে।কথিত আছে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা মসলিন উৎপাদন বন্ধ করার জন্য মসলিন বয়নকারী তাঁতিদের হাতের বুড়ো আঙুল কেটে নেয।তবে অধুনা অন্য আরেকটু দাবি বেশ যৌক্তিকভাবে সামনে উঠে এসেছে, তা হলো, তাঁতিদের হাত ব্রিটিশরা নয়, বরং তারা নিজেরাই নিজেদের আঙ্গুল কেটে নিতো, যাতে এই তাঁতের কাজ আর না করতে হয়।

মসলিন হারিয়ে গেলেও এটা পুনরুদ্ধার একেবারে অসম্ভব নয়। ঐতিহ্যবাহী মসলিন কাপড়ের হৃতগৌরব ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে বিসিক ও তাঁত বোর্ড। মূলত মসলিনের সমগোত্রীয় জামদানী কাপড়কে আরও উন্নত করবার মাধ্যমে মসলিনের পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। অন্যদিকে টানা তিন বছরের গবেষণা আর চেষ্টায় বারো হাত লম্বা একটি মসলিন বোনার দাবিও করেছেন উদ্যোক্তারা।প্রকৌশলীরা বলছেন, আড়াইশ’ কাউন্টের চেয়ে বেশি মিহি সাদা সূতা দিয়ে তৈরি বস্ত্রকেই মসলিন বলা যায়। এ বিবেচনায় দৃকের তৈরী কাপড়টিকেও মসলিন দাবি করা যায়। আগামী ফেব্রুয়ারিতে এই মসলিন প্রকাশ্যে আনার পরিকল্পনা আছে তাদের।

মসলিন আবারও ফিরে আসুক এই কামনা আর আশাবাদ নিয়ে শেষ করছি আজকের আয়োজন।

 

 

মাহীন বারী

 

 

Share Button
Print Friendly

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Close
Please support the site
By clicking any of these buttons you help our site to get better