বিদেশি ভাষা শিক্ষাঃ অনেক সুযোগ আছে জাপানিজে

আমাদের পৃথিবীটা দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। বিশ্বায়নের এই যুগে অন্যদেশ,অন্য জাতির মানুষদের সাথে যোগাযোগটাও তাই বাড়ছে। অন্যদেশের মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে তাদের ভাষা শেখাটা খুবই জরুরী। লিংগুয়া ফ্রাংকা হিসেবে ইংলিশের চল সারা পৃথিবীতেই আছে।কিন্তু উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে ইংলিশের ব্যবহারটা সেভাবে হয়না। যেমন ধরুন আপনি চীনে অথবা জাপানে বেড়াতে বা ব্যবসার কাজে গেলেন সেখানে খুব কম লোকই ইংলিশ জানেন।যদি আপনার তাদের ভাষা জানা থাকে,তবে তা অনেক কাজে দিবে।ইংলিশ ও বাংলার পাশাপাশি তৃতীয় একটি ভাষা শেখার গুরুত্ব বেড়েই চলছে। শুধু বাইরের দেশে পড়তে বা অভিবাসনের জন্যেই নয়।আমাদের দেশেই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে, সেখানেও সংশ্লিষ্ট ভাষা জানা লোকের চাহিদা বাড়ছে।

বিদেশি ভাষা শেখার জন্য মানসম্মত প্রতিষ্ঠান আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই আছে;আধুনিক ভাষা শিক্ষা ইনস্টিটিউট। বলা যায় দেশের প্রচলিত অন্য সব ভাষা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এটিই সবথেকে সেরা ও যুগোপযোগী।সর্বপ্রথম ১৯৬৪ সালে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে চালু হয় বিদেশি ভাষা বিভাগ।স্বাধীনতার পরে ১৯৭৪ সালে এটি আলাদা একটি ইনস্টিটিউটে পরিনত হয়।বর্তমানে এখানে ১২টি ভাষা শেখানো হয়।চাইনিজ,জাপানিজ,কোরিয়ান,এরাবিক,ফার্সী,তুর্কি,রুশ,জার্মান,স্প্যানিশ,ফ্রেঞ্চ।তাছাড়া শুধু বিদেশীদের জন্য বাংলা ও ঢাবি শিক্ষার্থীর জন্য ইংলিশ কোর্স এর ব্যাবস্থা। প্রতি বছরের মাঝামাঝি এই সময় অর্থাৎ মে,জুন মাসে ভর্তির বিজ্ঞপ্তি দেয় আধুনিক ভাষা শিক্ষা ইনস্টিটিউট।জুনিয়র,সিনিয়র,ডিপ্লোমা,উচ্চতর ডিপ্লোমা এই ধরনের কোর্স করার সুযোগ আছে এখানে।

অনেকেই আছেন এখানে বিদেশি ভাষা শিখতে চান,কিন্তু এখনো ঠিক করতে পারছেন না আসলে কোন ভাষাটা শেখা উচিত,কোন ভাষা তার জন্য সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত হবে। এমন সমস্যায় পড়াটা খুবই স্বাভাবিক। প্রত্যেকটা ভাষারই আলাদা আলাদা গুরুত্ব আছে।এর মধ্য থেকে উপযুক্ত ভাষা পছন্দ করাটাও অনেক কঠিন। যাইহোক,আজ আপনাদের কাছে বেশকয়েকটি ভাষার মধ্যে জাপানিজ ভাষা শিক্ষার বিস্তারিত তুলে ধরতে চাই, কেন এই ভাষাটি শিখবেন এ নিয়ে আলোচনা করতে চাই।

সুর্যোদয়ের দেশ জাপান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ আর নিয়মিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ এর ক্ষয়ক্ষতিকে পেছনে ফেলে জাপান নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশে পরিনত করেছে।আর প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার শীর্ষে পৌঁছেছে দূরপ্রাচ্যের এই দেশটি।

আপনি যদি বিদেশে পড়াশুনা করতে চান, জাপান হতে পারে একটি আকর্ষনীয় গন্তব্য।প্রতিবছর বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী এখানে পড়তে যায়।পশ্চাত্যের দেশগুলোর চেয়ে কোন অংশে পিছিয়ে নেই জাপান। বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের থেকেও এগিয়ে এশিয়ার এই দেশটি।

আপনি যদি উচ্চমাধ্যমিক পাস করে থাকেন তবে জাপানিজ ভাষার উপর অন্তত এক বছর মেয়াদী কোর্স করে জাপানে বিশ্ববিদ্যালয়/কলেজগুলোতে ব্যাচেলর অনার্সে ভর্তি হতে পারবেন, এবং যদি ব্যাচেলর অনার্স পাস করেন তবে মাস্টার্স প্রোগ্রামে ভর্তির সুযোগ পাবেন।অবশ্যই স্কলারশিপসহ, জাপানিজ ভাষা শেখা থাকলে স্কলারশিপ পাওয়াটা তেমন কঠিন কিছু না।উচ্চতর শিক্ষার ক্ষেত্রে আরো অনেক স্কলারশিপ আছে জাপানে, মনবুকাগাকুশো স্কলারশিপ,এশিয়ান ইয়ুথ ফেলোশিপ,এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক স্কলারশিপ,হিউম্যান রিসোর্স স্কলারশিপ ইত্যাদি।তাছাড়া গ্রাজুয়েট আর রিসার্চ লেভেলে প্রত্যেকটা সরকারী বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়েই আর্থিক সহায়তা ও স্কলারশিপ পাওয়া যায়।বাংলাদেশ থেকে যারা জাপানে পড়তে যায় তাদের অধিকাংশই কোন না কোন স্কলারশিপ বা ফান্ড নিয়েই পড়তে যায়।এই সুযোগটি আপনিও পেতে পারেন সহজেই যদি ভাষার উপর দক্ষতা থাকে।

শুধু ভাষা শিক্ষার উপরেও অনেক স্কলারশিপের ব্যাবস্থা আছে জাপানে,জাপানিজ দূতাবাসের ওয়েবসাইটে গেলেই এসবের খোঁজ মেলে। জেএলপিটি বা জাপানিজ ল্যাংগুয়েজ প্রফিসিয়েন্সি টেস্টে অংশ নিয়ে ভালো ফলাফল করলে জাপান সরকারের পক্ষ থেকেই পড়াশুনার জন্য আমন্ত্রন পেয়ে থাকেন শিক্ষার্থীরা। তাই দেশের বাইরে স্কলারশিপসহ পড়াশুনা করতে চাইলে জাপানিজ ভাষা নিশ্চিন্তে বেঁছে নিতে পারেন। জাপানের মত দ্বিতীয় কোন দেশ নেই যারা বিদেশি ছাত্রদের পড়াশুনার জন্য এমন সুযোগ দিয়ে থাকে।

পড়াশুনার পাশাপাশি খন্ডকালীন কাজ কিংবা পড়াশুনা শেষে স্থায়ীভাবে বসাবসের জন্যও জাপান অনেক সুযোগ করে দিয়েছে।বর্তমানে জাপানে জনসংখ্যা হ্রাসের ফলে কর্মক্ষম তরুন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পেয়েছে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে তাদের দরকার প্রচুর দক্ষ,শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ জনবল।কিন্তু জাপানের কর্মবাজারে বিদেশি হিসেবে প্রবেশের অন্যতম শর্ত জাপানিজ ভাষা জানা।আমরা এই সুযোগটা সহজেই নিতে পারি জাপানিজ ভাষা শিখে।পড়াশুনা ছাড়া প্রফেশনাল হিসবেও জাপানে গিয়ে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ আছে।এছাড়াও দেশে বিভিন্ন জাপানিজ প্রতিষ্ঠান ও দূতাবাসে দোভাষী ও অনুবাদক হিসেবে কাজ করার সুযোগ তো আছেই।

এতক্ষণ জাপানিজ ভাষা জানার বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা নিয়ে আলোচনা করলাম। এবার ভাষাটি কেমন তা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

অনেকের কাছেই জাপানিজ ভাষা খুব কঠিন লাগে, হিজিবিজি সব অক্ষর, বোঝাই দুস্কর!!!আসলেই কি তাই??? -না, ভাষাগত দিক চিন্তা করলে জাপানিজ মোটামুটি সহজ একটি ভাষা এবং অনেক নিয়মতান্ত্রিক।বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে বেশ সহজ লাগতে পারে,কেননা বাক্যের গঠনে জাপানিজের সাথে বাংলার শতকরা ৮০ ভাগ মিল আছে। আর যেহেতু এর গ্রামার অনেক নিয়মতান্ত্রিক, তাই এটি আয়ত্ত করাও তুলনামুলক ভাবে সহজ।অন্তত জার্মান,ফ্রেঞ্চের মত ল্যাটিন ভাষার থেকে এর গ্রামার সহজ।এই ভাষার গ্রামারে ফ্রেঞ্চ বা স্প্যানিশের মত জেন্ডারের ব্যাবহার নেই, টু বি ভার্ব সবগুলো পার্সনের জন্য একই রকম, ভার্ব ও টেন্সের ব্যাবহার একদম সহজ।আরো অনেক দিক আছে যা থেকে বলা যায় এটি তুলনামুলক সহজ ভাষা।

জাপানিজ ভাষা শিখতে প্রধান বাধা বলতে পারি, এই ভাষার ৩টি আলাদা আলাদা লেখার পদ্ধতি। ৩ টি হচ্ছে- হিরাগানা,কাতাকানা এবং কানজি। কানজি হচ্ছে জাপানিজ ভাষায় ব্যাবহৃত সেই সব চাইনিজ আক্ষর, যেগুলোর প্রত্যেকটি এক বা একাধিক অর্থ বহন করে।বহুকাল পূর্বে এই অক্ষর গুলো চীনা ভাষা থেকে জাপানিজ লেখ্য ভাষায় গ্রহণ করা হয়।তিন থেকে চার হাজারের উপরে কানজি থাকলেও জাপানের দৈনন্দিন জীবনে প্রায় দু’হাজারের মত কানজি ব্যাবহৃত হয়।

হিরাগানা, কানজি থেকে উদ্ভূত। কানজির সহজীকরণের মাধ্যমে হিরাগানার প্রচলন করা হয়, এটি জাপানিজ ভাষার শব্দের ক্ষেত্রে ব্যাবহৃত হয়। আর কাতাকানা সকল বিদেশি শব্দের লেখার ক্ষেত্রে ব্যাবহার করা হয়। ৩টি আলাদা লিখিত পদ্ধতি আয়ত্ত করা আপাতদৃষ্টিতে কঠিন মনে হলেও, আসলে ততটা কঠিন নয়। এগুলোও জাপানিজ গ্রামারের মত বেশ নিয়মতান্ত্রিক। আগ্রহ আর ইচ্ছা থাকলে শিখতে খুব বেশি সময় লাগে না। তবে প্রথমে হিরাগানা আর কাতাকানার উপর দক্ষ হতে হয়, এরপর কানজি শিখতে হয়।

এই ছিলো জাপানিজ ভাষার উপর খুঁটিনাটি আলোচনা।আশা করছি, এ আলোচনা আপনার ভাষা পছন্দের ক্ষেত্রে সামান্য হলেও সাহায্য করবে। তাছাড়া জাপানিজ ভাষার গুরুত্ব ও এ ভাষা সম্পর্কিত ভুল ধারনাও পরিস্কার হবে।

-সালেহীন কবির রিফাত

Share Button
Print Friendly

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Close
Please support the site
By clicking any of these buttons you help our site to get better