আইবিএ তে চান্স পাওয়া আমার জীবনের সবচেয়ে সুখকর মুহূর্ত গুলির একটা – মোঃ শাহরিয়ার আলম,পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোঃ শাহরিরার আলম শুধুমাত্র একজন সফল রাজনীতিবিদই নন একই সাথে সফল একজন উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ী ।ডিইউটাইমজ এর সাথে একান্ত সাক্ষাতকারে জানিয়েছেন তার শৈশব,শিক্ষাজীবনসহ আরো অনেক কথা । এই কথোপকথনের চুম্বকাংশ নিয়েই আমাদের এবারের আয়োজনঃ

UPq_lVvU

চট্টগ্রামে আসার পূর্বে আমি লালমনিরহাটে যে স্কুলে পড়তাম সেটার নাম ছিল চার্চ অফ গড জুনিয়র হাই স্কুল । আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষকের নাম ছিল রবিন দাশ । উনি অনেকবার ই বিদেশ ভ্রমণে গিয়েছেন । একবার আফ্রিকা(খুব সম্ভবত কেনিয়া) ভ্রমণের পর  সেইসব অভিজ্ঞতা আমাদের সাথে শেয়ার করলেন । সেখান থেকেই বহির্বিশ্বের প্রতি আমার আগ্রহ জন্মেছে যা আমাকে পররাষ্ট্র বিষয়ক কাজ করতে আগ্রহ জুগিয়েছে ।স্কুলের আরেকটি মজার ঘটনা বলছি, আমাদের স্কুলে মাঝেমধ্যেই দেশি বিদেশি অতিথি আসতেন । তখন আমাদের কাজ ছিল স্কুলের বাইরে সারিবদ্ধ ভাবে দারিয়ে তাঁদের স্বাগত জানানো । তৎকালীন সময়ে আমার বাবা রেল বিভাগে ছিলেন বিধায় তিনিও আমাদের স্কুলে আমন্ত্রিত হতেন । একবার একটি অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি হিসাবে আসলেন । তখন নিজের বাবাকেই স্বাগত জানাতে আমার কাছে অন্যরকম লেগেছিল ।তা ছাড়া আরও একটা মজার কাহিনী ছিল অতিথিদের আগমন উপলক্ষে পরের এক দিন ছুটি উপভোগ করা । এটা সত্যিই আমাদের কাছে অনেক আনন্দের একটা মুহূর্ত ছিল ।

এরপরই আমরা চট্টগ্রামে চলে গেলাম যেটা আমার কাছে ছিল পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবার মত অবস্থা । এখন সেটা হাসিমুখে বলতে পারলেও তখন ব্যাপারটা অনেক কষ্টকর ছিল । এটা খুব সম্ভবত ১৯৮০-৮২ সালের ঘটনা । তখন আমি প্রথম পাহাড়, নদী, সাগর দেখলাম । চট্টগ্রাম  কে  ভাল  লাগা   শুরু হল, নতুন জাগায় এলে যা হয় আর কি । সেখানে আমি আর আমার এক বন্ধু  স্ট্যাম্প জমানো শুরু করলাম । মাঝে মাঝে আমরা নিউমার্কেট থেকে স্ট্যাম্প কিনে আনতাম । তখন স্কুলে যাওয়ার জন্য আমাকে প্রতিদিন ২ টাকা দেয়া হত । আমি স্ট্যাম্প কেনার জন্য শেয়ারে রিক্সায় যেতাম । এটাও একটা মজার অভিজ্ঞতা একেক দিন একেক মানুষের সাথে রিক্সায় যাওয়া যাদেরকে আমি চিনি না । মাঝে মাঝে পুরো টাকা বাঁচানোর জন্য হেটেও স্কুলে চলে যেতাম ।

সেই সময় আমরা আরেকটি দুঃসাহসিক কাজ করতামসেটা হল, স্টেশন থেকে ট্রেন যখন ওয়ার্কশপে যেত আমরা ট্রেনের ইঞ্জিনে উঠে পরতাম । পাহাড়তলির কাছাকাছি এলে ইঞ্জিনের গতি একটু কমানো হত যাতে আমরা নেমে জেতে পারি । তবে কিছু কিছু চালক ট্রেন না থামিয়ে একেবারে ওয়ার্কশপে নিয়ে যেত । সেখানে নামলে আমাদের সাদা ইউনিফর্ম মবিল, তেল, রঙে পুরো নষ্ট হয়ে যেত । এছাড়া আটআনা করে সাইকেল ভাড়া পাওয়া যেত । আমরা প্রায়ই সাইকেল ভাড়া নিয়ে চালাতাম আর বিকেল হলেই আমার ফুপুর বাসায় চলে যেতাম টিভি দেখার জন্য । এখনকার মত তখন টিভি এতো সহজলভ্য হয়ে ওঠেনি ।

কিছুদিনের মধ্যেই আব্বার সাথে আমাকে রাজশাহীতে চলে যেতে হল । কিন্তু সেখানে আমার মন টিকল না । তাই আমি আব্বাকে না বলে তাঁর এক বন্ধুর সাথে চট্টগ্রামে চলে যাওয়ার প্লান করলাম । কিভাবে যেন আব্বা সেটা বুঝে ফেললো এবং আমাকে বাধা দেয়ার জন্য স্টেশনে চলে এলো । আব্বার অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমি চট্টগ্রামে চলে গেলাম । আম্মুকে ছেড়ে থাকা যে কত কঠিন কাজ সেটা আমি সেবার ই বুঝলাম ।

তখন আমি ৯ম কি ১০ম শ্রেণিতে পড়ি । রাজশাহী,নতুন জায়গা, নতুন বন্ধু… পড়াশোনা যে খুব বেশি করতাম টা কিন্তু নয় । পড়াশোনার পাশাপাশি আমি ক্রিকেট খেলতাম এবং হুট করে আমরা ক্রিকেট ক্লাব ও প্রতিষ্ঠা করে ফেলি । বর্তমানে সেই ক্লাব ঢাকায় ২য় শ্রেণিতে অংশ নিচ্ছে । সেই ক্লাবের পৃষ্ঠপোষকতা ও আমিই করি । জাতিও দলের বেশ কয়েকজন খেলোয়ারও আমাদের ক্লাবের সৃষ্টি ।

১৯৮৫ সালে আমি এসএসসি পরীক্ষায় ১ম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হলাম এবং নিউ গভঃ ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হলাম । ১৯৮৭ সালে এইচ এস সি পরীক্ষার পর ঢাকায় চলে আসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির প্রস্তুতি নেয়ার জন্য । কিন্তু রেজাল্টের পর দেখা গেল আমি এইচ এস সি তে ইংরেজি তে ফেল করেছি  (দুই পত্র  মিলিয়ে ৬০ নম্বর) । এটা আমার কাছে ছিল এক বিরাট ধাক্কা । এস এস সি তে  ১ম শ্রেণি পাওয়ার পর এইস এস সি তে এমন ফল আমি কল্পনাও করি নাই । পরীক্ষা ভাল দেয়ার পরও এমন ফল আমার জন্য ছিল বিশাল এক ধাক্কা । যদিও আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলাম ফল পুনঃ-নিরীক্ষণের বেপারে কিন্তু এক বছর দৌড়িয়েও আমার কোন লাভ হল না । যথারীতি ১৯৮৮ সালের এইচ এস সি পরীক্ষার সময় চলে এলো । তাই আর কোন উপায় না পেয়ে আমাকে পুনরায় পরীক্ষা দিতে হল । এবার আমার ১ম শ্রেণিতে পাশ এলো এবং ইংরেজি দুটি পত্রে যথাক্রমে ৬৮ ও ৭২ নাম্বার পেলাম । কিন্তু এই ১ বছরের ধাক্কা আমাকে আমার বন্ধুদের কাছ থেকে অনেক দূরে ঠেলে দিল । তারা ইতিমধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, মেডিক্যাল সহ নানা যায়গায় ভর্তি হয়ে গেছে । তাই আমি ঠিক করলাম তাদের পথে না হেটে  B.Com করব এবং এরপর CA । সে জন্য আমি ঢাকায় চলে এলাম এবং সিটি কলেজে ভর্তি হলাম । ঢাকায় থাকার জন্য যায়গা পাওয়া তখন আমার জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছিল ,ব্যাচেলরদের কে কেউ বাসা দিতে চাইতো না। এমন কোন এলাকা নেই যেখানে আমার থাকা হয় নাই । এই সমস্যা ছাড়াও আমার জন্য আরও একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল অ্যাকাউনটিং । নতুন বিষয়, কিছুই বুঝি না । শেষ পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক স্যারের কাছে ১ মাস থেকে বিষয়টি আয়ত্তে  এনেছিলাম।

B.Com এর পড়াশোনাও শেষ  দিকে আমি সার্কুলার দেখে আইবিএ এর ফর্ম তুললাম, নিতান্তই ঝোঁকের বশে তোলা । ফর্ম তুলেই আমি ঈদ এর ছুটিতে রাজশাহীতে চলে গেলাম । সাথে একটা ভর্তি গাইড সঙ্গে নিলাম শুধু । সেই সময় আমি আমার এক বন্ধুর প্ররোচনায় পরে তাকে সঙ্গ দেয়ার উদ্দেশ্যে টফেল এক্সাম দেই, এবং মজার কথা আমি তার চেয়ে বেশি নম্বর পেয়ে যাই ! যাইহোক, আমি আইবিএ এক্সাম দেই এবং … চান্স পেয়ে যাই ,আইবিএ তে চান্স পাওয়া আমার জীবনের সবচেয়ে সুখকর মুহূর্ত গুলির একটা ।

আইবিএ তে পড়াশোনার অংশ হিসাবে আমাকে যখন ইন্টার্ন করতে হত, তখন আমি এক গার্মেন্টস কোম্পানি কে বেছে নিয়েছিলাম, সেই সময় যদিও গার্মেন্টস ব্যবসায় কে উঁচু কোন ব্যবসায় হিসাবে দেখা হত না । এ কারণে আমার ইন্টার্ন এর স্যার আমাকে “সি” গ্রেড দিয়েছিলেন । ইন্টার্ন এর সময় আমি যে বেতন পেতাম সেটা অনেকের চাকুরীর তুলনায়ও অনেক বেশি ছিল । কিন্তু আমাকে সেই বিষয়টি আকর্ষণ করল না । যে জিনিসটি  আমি বুঝলাম সেটা হল বাংলাদেশ এ আরএমজি সেক্টরের অপার সম্ভাবনাময়ের সুযোগ ।

আইবিএ তে পড়াকালীন ই আমরা ৩ বন্ধুরা মিলে ঠিক করেছিলাম, আর যাই হোক কোন মালটি-ন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করব না । তো আমরা একটা কোম্পানি তৈরি করে ফেললাম । কিন্তু ২ বছরের মাথায় কোম্পানিটি বন্ধ করে দিতে হল । স্বাভাবিক ভাবেই তখন আরেকটি ধাক্কা খেলাম, নতুন বিয়ে করেছি, ছোট বাচ্চা । সেই সময়ে আমি একটা দারুণ অফার পেলাম । একটি ব্রিটিশ কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলে তাদের একটা অংশ তারা আমাদের পরিচালনা করার সুযোগ দিল । প্রতি মাসে তারা ৩০ হাজার পিস সার্ট এর অর্ডার দিবে এমন শর্ত তারা দিল । আমি লন্ডনে গিয়ে তাদের সাথে চুক্তি করে এলাম । কারণ আমি হিসাব করে দেখেছিলাম সামগ্রিক খরচ বাদ দিয়েও তৎকালীন সময়ে  বেশ টাকা লাভ করা সম্ভব । তাই আমি ক্যারিয়ারের দোদুল্যমান অবস্থায় থেকেও ঝুঁকি টি নিলাম । এখন প্রতি মাসেই আমরা কয়েক মিলিয়ন ডলারের এক্সপোর্ট করে থাকি ।

রাজনীতি তে আসা নিয়ে যদি কিছু বলতে হয় তাহলে আমি বলব বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরবর্তী সময়টার কথা । পত্রিকায় শিশু রাসেলের বিবরণ পরে খুব খারাপ লাগত ; মানুষ কিভাবে পেরেছিল তাকে মারতে… এ ধরনের চিন্তা মাথায় সবসময় ঘুরত । পরবর্তীতে আমাদের অনগ্রসর এলাকার উন্নয়নে এগিয়ে আসার সময় আমি রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ি ।ব্যবসায় আর রাজনীতি তে একসাথে চালানো প্রসঙ্গে আমি বলব, আমার প্রতিষ্ঠান সরকারের সাথে কোন ধরনের ব্যাবসায়িক সম্পর্ক করে না । এমনকি কোন সরকারি ব্যাংক এ আমার কোন অ্যাকাউন্ট ও নেই । তাই কোন সমস্যা হয়না বললেই চলে ।

সামনে একটি রেডিও চ্যানেল আমি চালু করতে যাচ্ছি, অনুমোদন আগেই পেয়েছিলাম কিন্তু সময়ের অভাবে করতে পারছি না । সেই চ্যানেলের নাম হবে, “রেডিও ঢোল” । শুধুমাত্র আমাদের নিজস্ব ফোক গানগুলোই সেখানে প্রচারিত হবে ।

 সাক্ষাতকার গ্রহণঃ মোঃশাফাত কাদির, মোঃখায়রুল বাশার এবং মোরসালিন অনিক

Share Button
Print Friendly

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Close
Please support the site
By clicking any of these buttons you help our site to get better